×

জাতীয়

আল-জাজিরার নিবন্ধ

বিএনপির বিশাল ব্যবধানে জয়ের নেপথ্যে যে কারণ

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম

বিএনপির বিশাল ব্যবধানে জয়ের নেপথ্যে যে কারণ

ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো বিপ্লবী পরিবর্তনের নয়, বরং ছিল হিসাব-নিকাশের নির্বাচন- এমন বিশ্লেষণ উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার প্রকাশিত এক নিবন্ধে। ভোট গণনা শেষে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) স্পষ্ট ব্যবধানে জয় পেয়েছে এবং শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলের পর রাজনৈতিক নির্বাসন কাটিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে।

নির্বাচনের ফলাফলকে অনেকেই ‘নাটকীয় প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখলেও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি জনতার ঢেউ নয়; বরং অসন্তোষের স্রোত এবং ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) পদ্ধতির অঙ্কের ফল।

ফলাফলে দেখা যায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮টি আসন পেয়েছে এবং জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মোট আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭। ১৯৯১ সালে দলটির সর্বোচ্চ আসন ছিল ১৮টি। সেই তুলনায় এবারের ফল উল্লেখযোগ্য সাফল্য। নির্বাচনের আগে থেকেই দলটির সমর্থন বৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলছিল, যা ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।

তবে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এফপিটিপি পদ্ধতিতে ভোটের হার বাড়লেই ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫১টি অর্জন করা যায় না। ফলে জামায়াতের উত্থান দৃশ্যমান হলেও তা জাতীয় ঢেউয়ে রূপ নেয়নি।

নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে যে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে, তা নির্বাচনের পটভূমি তৈরি করলেও ভোটারদের মধ্যে গভীর মতাদর্শিক ভাঙন সৃষ্টি হয়নি। ভোটার আনুগত্যের স্থায়ী পুনর্বিন্যাসও ঘটেনি। নির্বাচন ছিল মোটের ওপর স্বাভাবিক, যদিও কিছু ব্যতিক্রম ছিল।

দলীয় কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে যাননি। ফলে দোদুল্যমান (সুইং) ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ক্ষোভ তৈরি হয়। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর তৃণমূল পর্যায়ে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা বাড়ে। গ্রামীণ বাজার ও শহরতলিতে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

এই ক্ষোভের একটি অংশ জামায়াত বা এনসিপির দিকে ভোট সরিয়ে নেয়। অনেক বিএনপি সমর্থক ও দোদুল্যমান ভোটার সৎ বিকল্প খুঁজতে জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তবে তা স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি।

বিশ্লেষণে বলা হয়, বিএনপির সংগঠন ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের চেয়ে বড় ও গভীর। কিছু ভোট সরে গেলেও তাদের ভিত্তি অটুট ছিল। প্রার্থী মনোনয়নে দলটি কৌশলী ছিল, যেখানে জামায়াত তুলনামূলক অচেনা কিন্তু মতাদর্শে বিশ্বস্ত প্রার্থী দিয়েছে, সেখানে বিএনপি পরিচিত ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী মুখদের মনোনয়ন দিয়েছে।

গ্রামীণ ভোটারদের কাছে সংসদ সদস্য কেবল নীতিগত প্রতীক নন বরং নিরাপত্তা, চাকরি, স্থিতি ও বিরোধ মীমাংসার মধ্যস্থতাকারী। ফলে শুধু সততা নয়, পরিচিতি ও অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনিশ্চয়তার পরিস্থিতিতে অনেক ভোটার পরিচিত প্রার্থীকেই বেছে নিয়েছেন।

আরো পড়ুন : এ বিজয় গণতন্ত্রের, বাংলাদেশকে তাঁবেদারি রাষ্ট্র বানাতে দেয়া হবে না- তারেক রহমান

জামায়াতের কৌশলগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিল নারীর অধিকার নিয়ে দ্ব্যর্থক অবস্থান। কখনও আশ্বাস, কখনো ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা- এতে নারী ভোটারদের বড় অংশ আশ্বস্ত হননি। অথচ শ্রমবাজার, শিক্ষা ও ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ দেশের সামাজিক পরিবর্তনের বড় ভিত্তি।

এ ছাড়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতের পুনর্ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা বিস্তৃত অংশের ভোটারকে দূরে সরিয়ে দেয়। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ দেশের নৈতিক ভিত্তি, ক্ষমা করা যেতে পারে, কিন্তু ভুলে যাওয়া যায় না, এমন ধারণা জনমনে স্পষ্ট।

রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগে জামায়াত সংগঠিত শক্তির জোরে ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছে। তবে এই উত্থান ছিল অঞ্চলভিত্তিক। শ্রেণি, লিঙ্গ, শিক্ষা ও বয়সভেদে সমর্থনে বড় পার্থক্য ছিল। ফলে জাতীয় ঢেউ তৈরি হয়নি।

কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার এফপিটিপি ব্যবস্থায় কয়েক শতাংশ ভোটের হেরফেরেই ডজনখানেক আসন বদলে যেতে পারে। তবে ব্যাপক ও সমন্বিত সমর্থন ছাড়া জয় কঠিন।

বিশ্লেষণে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর অবশিষ্ট ভোট কম করে দেখা হয়েছিল। জরিপে ৫–৭ শতাংশ কট্টর সমর্থকের কথা বলা হলেও এর বাইরে ২০–২৫ শতাংশ অনিশ্চিত ভোটার ছিল। মাঠ গবেষণা ও জরিপে দেখা যায়, এদের বড় অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকেছেন। মতাদর্শগত কারণে নয়, বরং সম্ভাব্য বিজয়ী দলের সঙ্গে থাকার বাস্তব হিসাব থেকে। যেখানে বিএনপির পুরোনো নেতাদের আচরণে আওয়ামী সমর্থকেরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, সেখানে কেউ কেউ ভোট দেননি বা জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছেন। তবে জাতীয় পর্যায়ে ভারসাম্য গেছে বিএনপির দিকে।

নির্বাচনের আগে চারটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট বিশ্লেষণে উঠে আসে—আওয়ামী লীগের সমর্থন কম থাকলে বিএনপি অল্প ব্যবধানে এগোবে, মাঝারি সমর্থনে আরামদায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, প্রবল সমর্থনে দুই-তৃতীয়াংশও সম্ভব। কেবল সর্বস্তরের জামায়াত-ঢেউ এই সমীকরণ বদলাতে পারত। তবে তা ঘটেনি।

ফলে বিএনপির জয় হয়েছে কাঠামোগত সুবিধা, কৌশলী প্রার্থী নির্বাচন এবং ভোটারদের বাস্তব হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে। স্থানীয় দুর্নীতির কারণে কিছু ভোট জামায়াতের দিকে গেলেও এফপিটিপির অঙ্ক তা অতিক্রম করতে দেয়নি।

নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি আসন পেয়েছে। তীব্র মেরুকৃত পরিবেশে একটি নতুন দলের জন্য এটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি না থাকায় তাদের বিস্তৃত সমর্থন আসনে রূপ নিতে সীমাবদ্ধ থেকেছে।

সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ছিল রাগের সীমা, নৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের সীমা এবং ইতিহাস পুনর্ব্যাখ্যার সীমা নির্ধারণের নির্বাচন। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিএনপি দেশকে আবেগে না ভাসিয়ে বরং ভোটারদের বাস্তব মনস্তত্ত্ব বুঝেই জয় নিশ্চিত করেছে।

টাইমলাইন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

উখিয়ার রহমতের বিল থেকে ১৯ রোহিঙ্গা আটক

উখিয়ার রহমতের বিল থেকে ১৯ রোহিঙ্গা আটক

ইসরায়েলের মন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

ইসরায়েলের মন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

অনিয়মে ৫ ফার্মেসিকে ২৭ হাজার টাকা অর্থদণ্ড

অনিয়মে ৫ ফার্মেসিকে ২৭ হাজার টাকা অর্থদণ্ড

অবশেষে পাওয়া গেলো নিখোঁজ দুই ভাইয়ের মরদেহ

অবশেষে পাওয়া গেলো নিখোঁজ দুই ভাইয়ের মরদেহ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App