ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানতেন বলেই ‘জঙ্গি’ সাজিয়ে হত্যা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৪:২১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ভারতের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তথ্য জানতেন- এমন অভিযোগ তুলে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলামকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তাকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে উপস্থাপন করে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় তার স্ত্রী জেবুন্নাহার ও দুই শিশুকন্যাকে চার মাসেরও বেশি সময় গুম করে রেখে নির্যাতনের অভিযোগও আনা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি)সহ কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মেজর জাহিদকে হত্যার পর তার স্ত্রী জেবুন্নাহারের ওপর ব্যাপক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। তাকে আদালতে স্বামীর বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি’ সংশ্লিষ্ট স্বীকারোক্তি দিতে চাপ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল মামলার প্রধান আসামি পুলিশের সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হককে গ্রেফতার দেখিয়ে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।
পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ
ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়, ২০০৯ সালে সরকারের বাছাই করা সেনা কর্মকর্তাদের পিলখানায় পদায়ন করা হয়। সেই তালিকায় মেজর জাহিদুল ইসলামের নামও ছিল। তবে তিনি সেখানে যোগ দিতে আগ্রহী ছিলেন না এবং শেষ পর্যন্ত যোগদান করেননি।
সে সময় পিলখানায় তার কোর্সমেট শহীদ ক্যাপ্টেন মো. মাজহারুল হায়দার কর্মরত ছিলেন। অভিযোগে বলা হয়, ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের দিন ক্যাপ্টেন মাজহারুল ফোন করে মেজর জাহিদকে জানান যে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে- এ প্রশ্নের জবাবে ক্যাপ্টেন মাজহারুল জানান, বিডিআরের পোশাক পরা কিছু হিন্দিভাষী ব্যক্তি এ ঘটনায় জড়িত ছিল, যাদের তিনি আগে কখনও পিলখানায় দেখেননি।
সেই সময় মেজর জাহিদ বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করেন। ক্যাপ্টেন মাজহারুলের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের কারণে তৎকালীন সরকার তাকে নজরদারিতে রেখেছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
চাকরি ছাড়ার পর নজরদারি
অভিযোগে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীতে অযোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে মেজর জাহিদ অসন্তুষ্ট ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি ২০১৫ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে পরিবারসহ উত্তরার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন।
চাকরি ছাড়ার পরও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তার ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাত বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। পরে পরিবার নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করে তিনি উত্তরা ছেড়ে রূপনগরে চলে যান।
‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে হত্যার অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাত প্রায় ১১টার দিকে রূপনগর থানা পুলিশের একটি দল মেজর জাহিদকে হাত বেঁধে বাসা থেকে নিচে নিয়ে যায়। এরপর তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে রাত ১০টার দিকে তার স্ত্রী জেবুন্নাহার ও দুই শিশুকন্যার চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে বলা হয়, তিনি ও তার স্বামী জঙ্গি- এ কথা স্বীকার না করলে তাকেও তার স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তখন তিনি ধারণা করেন, তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। পরে পুলিশের এক সদস্য তাকে জানান, তারাই মেজর জাহিদকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
গত বছরের ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জেবুন্নাহার পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে আসামি করা হয়েছে সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)-এর তৎকালীন প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, মিরপুর বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আহমেদ, রূপনগর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীদ আলম, ডিবির তৎকালীন ডিসি কৃষ্ণ পদ রায় এবং রূপনগর থানার তৎকালীন অজ্ঞাতনামা কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে।
স্ত্রীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ
জেবুন্নাহারের অভিযোগ, তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। একই সঙ্গে মেজর জাহিদের বিরুদ্ধে একটি এবং তার নিজের বিরুদ্ধে দুটি সাজানো জঙ্গি মামলা দায়ের করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান।
জেবুন্নাহার বলেন, তার স্বামী শহীদ মেজর জাহিদুল ইসলামকে পরিকল্পিতভাবে জঙ্গি তকমা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এরপর তার ওপরও অমানবিক ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন না হলে হয়তো তাকে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হতো অথবা আরও কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো।
লাশ দাফন নিয়েও অভিযোগ
জেবুন্নাহারের ভাই জাহিদুল হক মজুমদারের অভিযোগ, মেজর জাহিদের মরদেহ দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পড়ে ছিল। পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিতে চাইলেও তা তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। পরে প্রায় আড়াই বছর পর বেওয়ারিশ হিসেবে মরদেহ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পরিবারের উদ্যোগে মরদেহ উদ্ধার করে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
