×

জাতীয়

র‍্যাবের ‘গোপন বন্দিশালা’ পরিদর্শন করলেন ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম

র‍্যাবের ‘গোপন বন্দিশালা’ পরিদর্শন করলেন ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা

ছবি: সংগৃহীত

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র‌্যাব পরিচালিত ‘গোপন বন্দিশালা’ পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতিরা। গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ-সংক্রান্ত মামলার বিচারিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহের জন্য শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর উত্তরায় র‍্যাব-১ সদর দপ্তরে যান তারা। 

ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আমিনুল ইসলাম নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন টিম, আসামিপক্ষের আইনজীবী, তদন্ত কর্মকর্তা, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, মায়ের ডাকের সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা তুলি এবং সাংবাদিকরা।

পরিদর্শন শেষে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, দেশের প্রচলিত আইনের ৫৩৯-বি ধারা, রোম স্ট্যাটিউটের রুল ৭ ও ৭৩ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রুলস অব প্রসিডিউরের রুল ৪৬ অনুযায়ী বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের বিধান রয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের পর ট্রাইব্যুনাল সেই বিধান অনুযায়ী পরিদর্শনের অনুমতি দেন।

আরো পড়ুন: চক্রান্ত নয়, দেশ গঠনে সবাইকে আত্মনিয়োগের আহ্বান তথ্যমন্ত্রীর

তিনি বলেন, বিচার শুধু কাগজপত্র ও সাক্ষ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। ঘটনাস্থল পরিদর্শনও বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

টিএফআই সেলকে ‘নির্মম টর্চার সেল’ বর্ণনা করে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “সেখানে ছোট-বড় ২৯টি কক্ষ রয়েছে। নিচে একটি অত্যন্ত ছোট ও সংকীর্ণ কক্ষ রয়েছে, যেখানে একজন স্বাভাবিক মানুষের লম্বা হয়ে শোয়ারও সুযোগ নেই। সাক্ষ্যপ্রমাণে দেখা গেছে— এসব কক্ষে মানুষকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর হাত-চোখ বেঁধে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো।”

আমিনুল ইসলাম বলেন, “গুমের শিকার বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিস্টার আরমান এই সেলে ছিলেন। কাউকে দীর্ঘদিন পর বিভিন্ন মামলায় ছেড়ে দেওয়া হলেও অনেককে হত্যা করা হয়েছে। ইলিয়াস আলীসহ গুমের শিকার আড়াই শতাধিক মানুষের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।”

প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “আটক ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা কিংবা পরিবারকে জানানোর বিধান মানা হয়নি। এতে সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬৭ ধারার লঙ্ঘন হয়েছে। বেআইনিভাবে আটক রাখা, হত্যা ও গুম—সবই মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে।”

আমিনুল বলেন, “অনেকে আয়নাঘর’র বিষয়টিকে রূপকথা মনে করতে পারেন, কিন্তু এটি ছিল বাস্তবতা। এই স্থাপনাই তৎকালীন সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের চরিত্র উন্মোচন করেছে। যাদের সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি ছিল, যারা মাঠপর্যায়ে কমান্ড বাস্তবায়ন করেছে এবং যে রাজনৈতিক শক্তি এসব অপরাধে সহায়তা করেছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা উচিত।”

প্রমাণ নষ্টের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “দেয়াল তুলে আলামত গোপনের চেষ্টা করা হয়েছিল। দেয়াল সরানোর পর ২৯টি কক্ষ ও নিচের কথিত ‘ডেথ সেল’-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আলামত নষ্ট বা গোপনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের ভূমিকাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”

তবে পরিদর্শন শেষে প্রধান কৌঁসুলির বক্তব্যের বিরোধিতা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

আরো পড়ুন: ৩৬ কোটি চোখ এখন জাতীয় সংসদের দিকে: ভারপ্রাপ্ত স্পিকার

র‍্যাবের সাত কর্মকর্তার পক্ষে আইনজীবী তাবারক হোসেন বলেন, “টিএফআই কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়। এটি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স, যেখানে র‍্যাবের দায়িত্ব ছিল সচিবালয়-সংক্রান্ত কাজ। তাই টিএফআই বলতে নির্দিষ্ট কোনো ভবনকে বোঝানো যায় না।”

সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, “আমার হাতে থাকা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র অনুযায়ী আটক ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।”

টর্চার সেলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সেখানে নির্যাতন হয়েছে কি না, সেটি আদালতে প্রমাণের বিষয়।”

ভবনের ছোট ছোট কক্ষের বিষয়ে আইনজীবী তবারক বলেন, “নিরাপত্তা ও প্রভোস্ট ইউনিটগুলোতে অস্থায়ীভাবে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য এ ধরনের সেল থাকে। ২৪ ঘণ্টার বেশি কাউকে রাখা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে আমি আদালতেই বক্তব্য দেব।”

তিনি বলেন, “গুম কমিশনের সদস্যরা পরিদর্শনের সময় বলেছিলেন, সেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর বিমান বা ট্রেনের শব্দ শোনার কথা থাকলেও তারা তা শুনতে পাননি।

“তাই এটি কথিত ‘আয়নাঘর’ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এটি একটি পরিত্যক্ত ভবনও হতে পারে।”

আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মেসবাহ বলেন, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাউকে আদালতে সোপর্দ করতে ব্যর্থ হলে সেটি বিভাগীয় ব্যবস্থার বিষয় হতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়।”

তিনি বলেন, “বিচার অবশ্যই হতে হবে, তবে তা ন্যায়বিচার হতে হবে। প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করে শাস্তি দিতে হবে এবং কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজাপ্রাপ্ত না হন, সেটিই ন্যায়বিচারের মূলনীতি।

“আমাদের আসামিরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন—এমন কোনো আলামত এখনো উপস্থাপন করা হয়নি।”

গত ২১ জুলাই র‍্যাব, ডিজিএফআই ও ডিবির কথিত গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের অনুমতি চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল-১ ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অনুমতি দেন।

প্রসিকিউশনের আবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী মতাবলম্বী ব্যক্তিদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন ও গুমের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে ঘটনাস্থলের বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা প্রয়োজন হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন।

এই মামলার ১০ আসামি বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের বিশেষ সাব-জেলে আছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন র‍্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে থাকা কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান (মশিউর জুয়েল), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন।

বাকি সাত আসামি পলাতক। তাদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, এম খুরশীদ হোসেন, মো. হারুন অর রশিদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

দায়িত্বে অনিয়ম-অবহেলা হলে কঠোর ব্যবস্থা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দায়িত্বে অনিয়ম-অবহেলা হলে কঠোর ব্যবস্থা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ দেশকে ধ্বংসের পথে নিয়েছিল: শিক্ষামন্ত্রী

আওয়ামী লীগ দেশকে ধ্বংসের পথে নিয়েছিল: শিক্ষামন্ত্রী

‘ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের ৪৫ ব্যবসায়ী’

বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ ‘ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের ৪৫ ব্যবসায়ী’

ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হলো নতুন সুবিধা

বাংলাদেশে এলো ট্যালি প্রাইম ৭.১ ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হলো নতুন সুবিধা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App