সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪২৩, প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সারাদেশে সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪২৩ জন নিহত এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। এতে দৈনিক গড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশু রয়েছেন।
রোববার (৪ অক্টোবর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
দেশের ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মোট নিহতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩২ দশমিক ৮৬ শতাংশ মারা গেছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। সেপ্টেম্বরে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অন্যদিকে, বেপরোয়া গতির কারণে পথচারী নিহতের হারও উদ্বেগজনক। এ সময়ে ১০৬ জন পথচারী প্রাণ হারিয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া দুর্ঘটনায় যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন, যা মোট নিহতের ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ।
আরও পড়ুন: ১৬ কোটি টাকার সোনাসহ বিমানের ২ কর্মী হেফাজতে
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে—১৭৮টি, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ। এছাড়া জাতীয় মহাসড়কে ১৪৫টি, গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি এবং শহরের সড়কে ৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ১৬৮টি (৩৮ শতাংশ), পথচারীকে চাপা বা ধাক্কায় ১০৯টি (২৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ), মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯৮টি (২২ দশমিক ১৭ শতাংশ), পেছন থেকে আঘাতে ৬১টি (১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ) এবং অন্যান্য কারণে ৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
যানবাহন ও বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান
নিহতদের মধ্যে চালক ও আরোহী ছাড়া থ্রি-হুইলার যাত্রী ৮৮ জন, বাসযাত্রী ২৬ জন, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের যাত্রী ২১ জন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্রলির আরোহী ১৯ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ১৮ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ৬ জন। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এসব দুর্ঘটনায় মোট ৬৯১টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট প্রাণহানির ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ, খুলনা বিভাগে ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ, বরিশালে ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ, রংপুরে ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং সিলেটে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে।
আরও পড়ুন: মদিনার বিদ্যুৎকেন্দ্রে হুথিদের হামলায় বাংলাদেশের নিন্দা
একক জেলা হিসেবে গাজীপুরে সর্বাধিক ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, রাজধানী ঢাকায় ৫২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের পেশাগত পরিচয় ও সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণ
নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ছিলেন সর্বোচ্চ ৫৮ জন। এছাড়া ২ জন পুলিশ সদস্য, ১ জন সেনাসদস্য, ১৩ জন শিক্ষক, ৩ জন সাংবাদিক, ২ জন চিকিৎসক, ৪ জন প্রকৌশলী, ১ জন কাস্টমস কর্মকর্তা, ১ জন বিদেশি নাগরিক, ব্যাংক-বিমার ১১ জন কর্মকর্তা, ১৮ জন এনজিও কর্মী, ২৪ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ২৫ জন ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য পেশাজীবী রয়েছেন।
দিনের সময় বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে—২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং দুপুরে—২১ দশমিক ২৬ শতাংশ। এছাড়া ভোরে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, বিকেলে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং রাতে ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রেল ও নৌপথের চিত্র
একই সময়ে নৌ ও রেলপথেও দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বরে ১১টি নৌদুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ৭ জন আহত এবং ৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন। অন্যদিকে, ২৩টি রেল ট্র্যাকিং দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়েছেন।
সংস্থাটি জানায়, সিংহভাগ দুর্ঘটনাই বেপরোয়া গতি ও অদক্ষতার কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘটছে। ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও যানবাহন, চালকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং চাঁদাবাজিকে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন এবং বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর সংস্কার;
গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা;
মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার এবং রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু;
চালকদের বেতন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা;
মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ এবং যৌথ যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন।
