পে-স্কেলে বেতন দ্বিগুণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন শঙ্কা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
প্রায় এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আসতে যাচ্ছে। নবম জাতীয় পে-স্কেলে প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লেও বাড়তি অর্থের প্রবাহে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এমন আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর পড়তে পারে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দীর্ঘ সময় পর বেতন কাঠামো পরিবর্তন হলে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। তবে একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর কিছুটা আর্থিক চাপ তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে।
সর্বোচ্চ বেতন হতে পারে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা
নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা হতে পারে।
নবম জাতীয় বেতন কমিশন অবশ্য মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। পরে সরকারি পর্যায়ে পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সুপারিশে বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে নতুন পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম বছরে বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে। পরবর্তী বছরে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, চলতি বছরেই নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হবে। সচিব কমিটির সদস্যরা এরই মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, পে-স্কেলের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে। এতে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। এর আগের মাসে জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। টানা কয়েক মাস ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পর জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও নতুন পে-স্কেলের কারণে পরিস্থিতি আবার চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সুবিধা পাবেন সীমিতসংখ্যক মানুষ
দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবই কম। নতুন পে-স্কেলের সরাসরি আর্থিক সুবিধা মূলত এই সীমিতসংখ্যক সরকারি কর্মচারীর মধ্যেই থাকবে।
অন্যদিকে বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও সীমিত আয়ের মানুষের আয় একই হারে না বাড়লেও বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বাড়লে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। ফলে পে-স্কেলের পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
করণীয় কী
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। একই সঙ্গে বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ যাতে মূল্যস্ফীতিকে উসকে না দেয়, সে বিষয়েও নজর রাখতে হবে।
পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো ঠেকাতে বাজার তদারকি জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পে-স্কেলের বাইরে থাকা সীমিত আয়ের মানুষকে সহায়তা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও রেশনিংয়ের আওতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
পে-স্কেলের পটভূমি
অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। পরে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ দিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল যেমন দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তেমনি এটি বাস্তবায়নের ফলে মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
