নিরাময়কেন্দ্রেই বন্দিশালা, তমিজীকে নিয়ে হারুনের বিস্ফোরক তথ্য
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের আড়ালে যেন গড়ে উঠেছিল একটি বন্দিশালা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হক গ্রুপের কর্ণধার আদম তমিজী হককে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে না পাঠিয়ে রাজধানীর একটি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, শুধু আটকে রাখাই নয়, তমিজী হককে মানসিক রোগী হিসেবে প্রমাণেরও চেষ্টা করা হয়েছিল।
এ ঘটনায় নিরাময়কেন্দ্রটির ভূমিকা, অর্থ আদায় এবং তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কীভাবে এমন একটি বন্দিশালা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর হক গ্রুপের কর্ণধার ব্যবসায়ী আদম তমিজী হক ফেসবুক লাইভে এসে তৎকালীন ক্ষমতাসীন হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য দেন। এরপরই তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের নেতৃত্বে তার ওপর নজরদারি শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। একপর্যায়ে তমিজীকে গ্রেপ্তার করা হলেও কারাগারে পাঠানো হয়নি। বরং রাজধানীর একটি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে তাকে রাখা হয়।
আরও পড়ুন: প্যারোলে মুক্তি পাচ্ছেন সাবেক মন্ত্রী দিপু মনি
অভিযোগ রয়েছে, সেখানে আটকে রাখার পর তমিজীর পরিবারের কাছ থেকে কয়েক দফায় বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করেন হারুন ও তার সহযোগীরা।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তমিজীকে সেখানে আটকে রাখার বিনিময়ে বীকন পয়েন্ট নামের ওই নিরাময়কেন্দ্রও কয়েক লাখ টাকা সার্ভিস চার্জ নেয়। পরে তাকে মানসিক রোগী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য বাইরে থেকে কয়েকজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে ডেকে আনা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের কেউ তমিজীকে মানসিক রোগী হিসেবে সনদ দিতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চিকিৎসকদলের এক সদস্য সম্প্রতি এক গণমাধ্যমকে বলেন, তমিজী হককে পরীক্ষা করে তাদের কাছে মানসিক রোগী বলে মনে হয়নি। এরপরও তাকে সেখানে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়। চিকিৎসকরা নিয়ম অনুযায়ী এ বিষয়ে আদালতের আদেশ আনতে বললে হারুন ক্ষুব্ধ হন বলে দাবি ওই চিকিৎসকের। এ সময় বীকন পয়েন্টের কয়েকজন কর্মকর্তাও হারুনের পক্ষ নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ।
সূত্রের দাবি, শেষ পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা সনদ ছাড়াই তমিজীকে বেশ কিছুদিন ওই কেন্দ্রে রাখা হয়। বিষয়টি গোপন রাখতে নিরাময়কেন্দ্রটির একটি ফ্লোর খালি করে সেখানে বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে একাই রাখা হয়েছিল। তার জন্য আলাদা খাবার, পানীয় ও বিনোদনের ব্যবস্থাও করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
আরও পড়ুন: মাদক সেবন করিয়ে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণের অভিযোগ
এ বিষয়ে নারকোটিক্সের এক উপপরিচালক সম্প্রতি এক গণমাধ্যমকে বলেন, বীকন পয়েন্টে তমিজী হককে অবৈধভাবে আটকে রাখার বিষয়টি জানার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার ভাষ্য, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ডিবি হারুনের ঘনিষ্ঠতা ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’। ফলে হারুনের কোনো কর্মকাণ্ড বেআইনি হলেও তাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন রয়েছে- এমনটাই সবাই ধরে নিতেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু তমিজী হক নন, রাজধানীর বিভিন্ন মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রকে ঘিরে আরও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও পরকীয়া প্রেমিকের সহায়তায় স্বামীকে মাদকাসক্ত সাজিয়ে দীর্ঘদিন আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। আবার সম্পত্তির বিরোধে এক ভাইকে অন্য ভাই আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: অচেনা শহরে হঠাৎ পরিচিত ডাক
এ ছাড়া একটি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এক তরুণী ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে সামাজিক মর্যাদার কথা বিবেচনা করে তার পরিবার এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ করেনি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর পর দীর্ঘসময় মরদেহ গোপন রাখার অভিযোগও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব অনিয়মের অনেক ঘটনাই অজ্ঞাত কারণে প্রকাশ্যে আসে না। ফলে অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
