×

জাতীয়

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন-ভাতাসহ যেসব সুবিধা পান

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন-ভাতাসহ যেসব সুবিধা পান

ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে। তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সরকারপ্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা।

ফলে রাষ্ট্রপতির পদটি মর্যাদা ও সাংবিধানিক গুরুত্বের দিক থেকে সর্বোচ্চ হলেও তাঁর বাস্তব নির্বাহী ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। অন্যান্য অধিকাংশ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।

সম্প্রতি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য প্রার্থী দেওয়ায় প্রায় ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা

সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে বাধ্য নন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সাধারণত সেই দলের সংসদীয় দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।

তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখেন। রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পাঠাতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করেন।

তবে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না কিংবা কী পরামর্শ দিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো আদালত তদন্ত করতে পারে না।

দণ্ড মওকুফের ক্ষমতা

রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করার ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে এ ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।

কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড রাষ্ট্রপতি নির্ধারিত সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করতে পারেন।

রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি

দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়মুক্তি রয়েছে। তাঁর কার্যকাল চলাকালে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তাঁকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত থেকে পরোয়ানাও জারি করা যায় না।

তবে রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণভাবে অপসারণের বাইরে নন। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাঁকে অভিশংসন করা যায়। শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও তাঁকে অপসারণের সাংবিধানিক বিধান রয়েছে।

অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। রাষ্ট্রপতিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার পর সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস হলে তাঁর পদ শূন্য হয়।

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকেন। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আবদুল হামিদ পরপর দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে সংসদ সদস্য থাকতে পারেন না। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর হতে হয় এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়। তবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

আগে অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পুনরায় রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না।

জনগণের সরাসরি ভোটে নয়

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। জাতীয় সংসদের সদস্যরা তাঁকে নির্বাচিত করেন।

একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন এবং অন্য একজন তা সমর্থন করেন। একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে সর্বাধিক ভোট পাওয়া ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা

রাষ্ট্রপতির আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত হয়েছে ‘দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (সংশোধন) অ্যাক্ট’-এ। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এ বেতন আয়করমুক্ত।

সর্বশেষ ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতির বেতন বাড়ানো হয়। এর আগে মাসিক বেতন ছিল ৬১ হাজার ২০০ টাকা।

রাষ্ট্রপতির আপ্যায়ন বা এন্টারটেইনমেন্টের জন্য বার্ষিক ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে।

বঙ্গভবন, গাড়ি ও সরকারি সুবিধা

রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন। এর সাজসজ্জা, রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়।

সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে গাড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিবহন সুবিধা দেওয়া হয়। সরকারি কাজে বিদেশ সফরের সময় সরকার নির্ধারিত হারে ভাতাও তিনি পান।

বছরে ২ কোটি টাকার স্বেচ্ছাধীন তহবিল

রাষ্ট্রপতির জন্য স্বেচ্ছাধীন তহবিল রয়েছে। বছরে এ তহবিলের পরিমাণ ২ কোটি টাকা। রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ অর্থ ব্যয় করা যায়।

রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্যও বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশের যেকোনো হাসপাতালে তাঁরা বিনা খরচে চিকিৎসা নিতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শে বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ও সরকার বহন করে।

রাষ্ট্রপতির বিমানভ্রমণের জন্য বিমা সুবিধা রয়েছে, যার বর্তমান পরিমাণ বছরে ২৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের আগে এ সুবিধার পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ টাকা।

অর্থাৎ বেতনের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি সরকারি বাসভবন, গাড়ি, চিকিৎসা, বিদেশ সফরের ভাতা, আপ্যায়ন ও বিমানভ্রমণসহ দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা পান।

রাষ্ট্রপতির প্রকৃত ক্ষমতা কতটুকু?

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক ব্যক্তি হলেও সরকারের প্রধান নন। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।

সংসদে কোনো দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধানের পদটির সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি মর্যাদা ও সাংবিধানিক গুরুত্বের দিক থেকে সর্বোচ্চ হলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। রাষ্ট্রপতির প্রধান ভূমিকা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা; আর সরকারের কার্যকর নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সাবেক রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে ভুল সংবাদ প্রকাশ

সাবেক রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে ভুল সংবাদ প্রকাশ

মাজার জিয়ারত আর নামাজ ছাড়া রাষ্ট্রপতির কাজ নেই: অলি আহমদ

মাজার জিয়ারত আর নামাজ ছাড়া রাষ্ট্রপতির কাজ নেই: অলি আহমদ

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হলেন রিজভী

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হলেন রিজভী

কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি ৬ সংসদ সদস্য

কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি ৬ সংসদ সদস্য

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App