সাত মাসেই কঠিন চাপে সরকার
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট এবং সার সরবরাহ এই তিন ইস্যুতে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাত মাসের মধ্যেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, শহর-গ্রামে লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট এবং মাঠপর্যায়ে সারের কৃত্রিম সংকট সব মিলিয়ে তিনটি মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপ বাড়ছে।
এসব ইস্যু নিয়ে শুধু বিরোধী রাজনৈতিক মহলেই প্রশ্ন উঠছে না, খোদ বিএনপির সংসদীয় দলের সভাতেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-গ্যাস এবং সার পরিস্থিতির কারণ ও সরকারের করণীয় নিয়ে সংসদ সদস্যদের সামনে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্তদের।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি সচল রাখা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংগ্রহ ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু একটি অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করার পরামর্শ দেন তিনি।
তার মতে, স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মধ্যমেয়াদে নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তাসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাত ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দুর্বল হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাহত হবে। বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এসব খাত একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বাড়ছে উদ্বেগ
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান সালাহউদ্দিন আহমদ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত)।
সরকারের সাত মাসে আগের সময়ের মতো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা পুলিশের নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ না থাকলেও খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে দেশে দুই হাজারের বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে ২১ হাজার ৭৫৬টি মামলা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও প্রকাশ্যে অপরাধের ঘটনায় মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সরকার গঠনের শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত মে মাসে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে মব সহিংসতা, কিশোর গ্যাং এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে এখনো কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি সংসদ ভবনের সামনেও ছিনতাইয়ের ঘটনায় এক শিক্ষিকার মৃত্যুর ঘটনা জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সরকারের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় হত্যাকাণ্ড কিছুটা বেড়েছে, যদিও চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা কমেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে দ্বিমুখী চাপ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও বড় ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে। সরকারের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে এ খাতে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন বর্তমান সরকারকে সামলাতে হচ্ছে।
এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি সংকটকে আরও জটিল করেছে। গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি শহরেও বেড়েছে লোডশেডিং। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সরাসরি জনজীবন এবং অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
দেশে সরকারি মালিকানাধীন ৬৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ৩০২ মেগাওয়াট। বেসরকারি খাতের ৬৯টি কেন্দ্রের সক্ষমতা ১০ হাজার ৮৫৩ মেগাওয়াট। সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানাধীন তিনটি কেন্দ্রের সক্ষমতা আরও ৩ হাজার ৬৮ মেগাওয়াট।
সব মিলিয়ে দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে গড়ে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় ঘাটতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সরকার অবশ্য আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতির আশা করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পর্যাপ্ত মজুদের পরও মাঠে সারের সংকট
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কৃষি খাতেও দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। সরকারের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চলতি বছরের অক্টোবর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট সারের চাহিদা ধরা হয়েছে ৪০ দশমিক ২৯ লাখ টন। বিপরীতে সরকারের মজুদ রয়েছে ৫৪ দশমিক ৪৮ লাখ টন সার। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৪ দশমিক ১৯ লাখ টন অতিরিক্ত মজুদ থাকার কথা।
তারপরও মাঠপর্যায়ে সংকট দেখা দেওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একটি চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২৫ আগস্ট সার উত্তোলন, বিতরণ এবং ডিলার নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে তিন সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যাতে সার ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত না হয়। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়ম ও সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সংসদীয় দলের সভায় মন্ত্রীদের জবাবদিহি
আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-গ্যাস এবং সার পরিস্থিতি নিয়ে শাসক দলের ভেতরেও উদ্বেগ রয়েছে। গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দলের সংসদীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বিভিন্ন সংসদ সদস্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ সংকট এবং সার বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা পরিস্থিতি এবং সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিভিন্ন এলাকায় মব সহিংসতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিকভাবে সরকারের জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত) সংসদ সদস্যদের জানান, আগের সরকারের রেখে যাওয়া অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে অল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। তবে শহর ও গ্রামের মধ্যে লোডশেডিংয়ের ভারসাম্য আনার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে সার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের নাশকতা বা কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।
সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদ্যুৎ-জ্বালানি, গ্যাস ও সার পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে সঠিক তথ্য দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে সংকটের কারণ নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাসের মাথায় আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং সার এই তিন সংকট বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে জনভোগান্তির পাশাপাশি অর্থনীতি ও কৃষি উৎপাদনেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
