পে-স্কেলের আগেই বাজারে আগুন, চাপে ভোক্তা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ঘোষণার আলোচনা শুরু হতেই নিত্যপণ্যের বাজারে অস্বস্তি বাড়তে শুরু করেছে। একদিকে সীমিতসংখ্যক সরকারি চাকরিজীবীর বেতন বাড়ার সম্ভাবনা স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এ সুযোগকে কেন্দ্র করে বাজারে আগাম মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা উদ্বেগ বাড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
প্রচলিত আছে, কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ার সম্ভাবনায় যেখানে এক শ্রেণির মানুষের স্বস্তি, সেখানে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কায় উৎকণ্ঠিত নিম্ন ও মধ্যবিত্তসহ কোটি কোটি মানুষ। কারণ, বেতন বাড়ার আগেই যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে বাড়তি আয়ের সুফল যেমন সীমিত হয়ে যাবে, তেমনি যাদের আয় বাড়ছে না তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে-স্কেল মূল সমস্যা নয়। প্রকৃত সংকট বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের অসংগতি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে পে-স্কেলের আলোচনা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পরিণত হতে পারে।
মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
তার মতে, সরকারি খাতে বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতেও আয় বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও থাকে। তাই সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও বেতন বৃদ্ধির ফলে কিছুটা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, নতুন পে-স্কেলের মাধ্যমে সরকার বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করেছে, তবে বাজার পরিস্থিতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বিদ্যমান জ্বালানি সংকট, উৎপাদন খাতে স্থবিরতা এবং রাজস্ব আহরণে দুর্বলতার মধ্যেই বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
তার মতে, এর ফলে সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়তে পারে এবং উন্নয়ন ব্যয়েও কাটছাঁটের প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের কর্মজীবীদের ওপরও পরোক্ষ চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পে-স্কেলের অজুহাতে বাজারে আগাম চাপ
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কার মধ্যেই বাজারে কিছু পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেতন বৃদ্ধি সরাসরি মূল্যস্ফীতির একমাত্র কারণ নয়।
মূল সমস্যা হলো দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং বাজার সিন্ডিকেটের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উৎপাদন ও আমদানি থেকে শুরু করে পাইকারি এবং খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে নজরদারি বাড়াতে হবে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ার কারণে সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে না। তাহলে পে-স্কেল ঘোষণার আলোচনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাল, ডাল, তেল কিংবা সবজির দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
যাদের আয় বাড়বে না, চাপ তাদের ওপরই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল আলম বলেন, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বেসরকারি চাকরি, কৃষি, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে যুক্ত। তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পে-স্কেল নেই কিংবা নির্দিষ্ট সময় পর আয় বৃদ্ধির নিশ্চয়তাও নেই।
কিন্তু বাজারে গিয়ে সরকারি চাকরিজীবী থেকে শুরু করে পোশাকশ্রমিক, দোকানকর্মী কিংবা দিনমজুর—সবাইকে একই দামে নিত্যপণ্য কিনতে হয়।
এখানেই তৈরি হয় বড় ধরনের বৈষম্য। একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আয় বাড়ার সম্ভাবনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যদি বাজারের সব পণ্যের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই মানুষগুলো, যাদের আয় বাড়ার কোনো সুযোগ নেই।
তার মতে, সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন বৃদ্ধির অধিকার রয়েছে। তবে সমস্যা পে-স্কেল নয়, সমস্যা হলো বেতন বৃদ্ধির অজুহাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং আগাম দাম বাড়ানোর প্রবণতা।
একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়লে সবজি উৎপাদনের খরচ বাড়ে না, ডাল আমদানির ব্যয়ও বাড়ে না। তাই পে-স্কেলকে কেন্দ্র করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর পেছনে যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিম্ন ও মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে বড় ধাক্কা
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আফসানা হক বলেন, কারও বেতন বাড়লে তাতে আপত্তির কিছু নেই। বরং মানুষের আয় বৃদ্ধি হওয়া আনন্দের বিষয়। কিন্তু সেই সুযোগে বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
সীমিত আয়ের মানুষকে প্রতি মাসে ঘরভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ বিভিন্ন খরচ মেটাতে হয়। সব ব্যয় সামলানোর পর খাদ্য কেনার জন্য যে অর্থ থাকে, বাজারের মূল্যবৃদ্ধি সেই হিসাব ওলটপালট করে দেয়।
ফলে অনেক পরিবারকে খাবারের তালিকা থেকে পুষ্টিকর পণ্য বাদ দিতে হয়। কেউ চিকিৎসা খরচ কমান, আবার কেউ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় কাটছাঁট করেন।
এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও যাদের আয় অপরিবর্তিত থাকবে, তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে সেই চাপ সামলাবে কে?
ব্যবসায়ীদের প্রতি দাম না বাড়ানোর আহ্বান
নতুন পে-স্কেল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নিত্যপণ্যের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের আহ্বায়ক মো. ফজলুল হক বলেন, পে-স্কেলের সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাই বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি না করে ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
তার মতে, পণ্যের দাম সামান্য বাড়লেও সরকারি চাকরিজীবীদের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষ।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর জোর
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী নেতা হাজি হাসমত উল্লাহ বলেন, চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, আটা, ময়দাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চাহিদা অনুযায়ী স্বাভাবিক রাখা গেলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমে যাবে।
তবে উৎপাদন সচল রাখতে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিদ্যমান জ্বালানি সংকটের মধ্যেও বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
তার অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, আমদানি কার্যক্রম এবং মিল পর্যায়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা না গেলে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে। এ জন্য জ্বালানি সংকট নিরসনের পাশাপাশি এলসি-সংক্রান্ত জটিলতার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
কারওয়ান বাজার কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান সুজন বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে অনিবন্ধিত ব্যবসায়ী ও ফুটপাতের হকারদেরও কার্যকর তদারকির আওতায় আনা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় হাতবদল কমাতে হবে।
তার মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে হয়রানি ও অতিরিক্ত ব্যয় বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মিলগেট, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পণ্যের মূল্য তদারকি জোরদার করতে হবে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বেসরকারি খাতকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে সেই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যদি বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে এর সুফল সীমিত থাকবে এবং ক্ষতির বোঝা গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
তাই নতুন পে-স্কেলকে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত হতে না দিয়ে এখনই সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
