×

জাতীয়

আওয়ামী আমল

উন্নয়নের আড়ালে ২৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২২ পিএম

উন্নয়নের আড়ালে ২৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি

ছবি : সংগৃহীত

উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণ, সরকারি নিয়োগ, ঠিকাদারি বিল, ভ্যাট-কর আদায় এবং বাজার ও মার্কেটের ভাড়া ব্যবস্থাপনাসহ স্থানীয় সরকার খাতের ৬৬টি ক্ষেত্রে অনিয়মের তথ্য পেয়েছে সরকারি তদন্ত কমিটি। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এসব অনিয়মের আর্থিক পরিমাণ ২৭ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগগুলোর অধিকতর তদন্তের জন্য গত ১৯ অক্টোবর প্রতিবেদনটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রতিবেদনে আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগে অনিয়ম এবং নির্মাণকাজের মান যাচাই ছাড়াই বিল পরিশোধের মতো বিষয় উঠে এসেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছর এবং পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করে তৈরি প্রতিবেদনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট নথি, অডিট প্রতিবেদন, প্রকল্পের হিসাব এবং আগের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে। প্রতিবেদনে দায়ীদের শনাক্ত করে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য অভিযোগগুলোর একটি পিরোজপুরে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প। এসব প্রকল্পে ৬ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য উল্লেখ করেছে তদন্ত কমিটি।

প্রতিবেদনে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, মোটরযান কেনা ও মেরামত, অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বাইরে বেতন-ভাতা প্রদান এবং সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।

প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও তিনটি মোটরযান-সংক্রান্ত ঘটনায় ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, গাড়ি মেরামতের অর্থ চালকের ব্যাংক হিসাবে দেওয়ার ঘটনায় ২৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বাইরে বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে ৪৮ কোটি ১০ লাখ টাকার অনিয়মের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি নকশা অনুসরণ না করে সড়ক নির্মাণ এবং পাঁচটি কালভার্ট নির্মাণ না করেই ব্যয় দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, গাজীপুর, বরিশাল, রংপুর, খুলনা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আদায়, ভ্যাট-কর জমা, ঠিকাদারি বিল, নির্মাণকাজ, বাজার ও মার্কেট বরাদ্দ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রোড কাটিং ফি থেকে আদায় করা অর্থের ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় দণ্ডসুদসহ দুই কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।

একই সিটি করপোরেশনের ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বিভিন্ন কাজ ও সেবার বিপরীতে ভ্যাট কর্তন এবং জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নির্মাণকাজে নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা না করেই ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার ২২৯ টাকার বিল পরিশোধের তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সিটি করপোরেশনগুলোর বাজার, মার্কেট ও বিভিন্ন স্থাপনার ভাড়া আদায়েও বড় অঙ্কের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর, বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশনের মার্কেট ও স্থাপনার ভাড়া আদায়সংক্রান্ত ঘটনায় ১৮৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স ফি আদায় না করার ঘটনায় ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং কমিউনিটি সেন্টার ও মার্কেটের দোকানভাড়া আদায় না করার ঘটনায় ৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকার অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।

রংপুর সিটি করপোরেশনে অর্থবছর শেষে প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিয়ে অন্য তহবিলে স্থানান্তরের ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা স্থানান্তরের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর ও সিটি করপোরেশনের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সম্পদসংক্রান্ত ৬৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের মেয়াদকালে নিয়োগ-বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কার্যক্রম ও বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে অধিকতর তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

প্রতিবেদনে কুমিল্লা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নসরুলের বিরুদ্ধে ৬০ কোটি টাকার টয়লেট নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় অধিকতর তদন্তের পাশাপাশি বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

পানির গুণগতমান পরীক্ষার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে কেনাকাটা, দরপত্র ও বিল পরিশোধেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ প্রকল্পে ২৪ কোটি টাকা বিল পরিশোধে অনিয়মের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য প্রতিবেদনে রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-পিইডিপি-৩-এর অর্থ ব্যবহারে প্রায় ৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের তথ্যও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

কমিটির তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করলেও শতাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে বিলম্বজনিত জরিমানা আদায় করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ার পরও জরিমানার বড় অংশ মওকুফ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে দায় নির্ধারণ এবং আদায়যোগ্য অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করতে অধিকতর তদন্তের সুপারিশ করেছে কমিটি।

স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত কমিটি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার অভিযোগপত্র, প্রকল্পের অডিট প্রতিবেদন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট নথি এবং আগের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি দায়ীদের শনাক্ত করা, আদায়যোগ্য অর্থ নির্ধারণ, বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ জন্য প্রতিবেদনটি দুদকে পাঠানো হয়েছে।

তবে তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় এবং প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে দুদকের তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, সেবা পেলেন ২০০ মানুষ

যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, সেবা পেলেন ২০০ মানুষ

উন্নয়নের আড়ালে ২৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি

আওয়ামী আমল উন্নয়নের আড়ালে ২৮ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তারেক রহমানের অঙ্গীকারের প্রশংসা করলেন তাকাইচি

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তারেক রহমানের অঙ্গীকারের প্রশংসা করলেন তাকাইচি

সরকার ধীরে ধীরে আ.লীগের মতো স্বৈরাচারী হয়ে উঠছে: নাহিদ ইসলাম

সরকার ধীরে ধীরে আ.লীগের মতো স্বৈরাচারী হয়ে উঠছে: নাহিদ ইসলাম

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App