সংকটে এনসিপি, একের পর এক শীর্ষ নেতার পদত্যাগ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
রাজনৈতিকভাবে তীব্র চাপে পড়েছে নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্য ও নির্বাচনি সমঝোতার সিদ্ধান্তের পর থেকেই দলটিতে শুরু হয়েছে অভ্যন্তরীণ ভাঙন। ওই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এনসিপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ শুরু হয়, যা ক্রমেই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে কেন্দ্রসহ সারা দেশের এনসিপির পরিচিত মুখগুলোর বড় একটি অংশই পদত্যাগ করেছেন।
এর পাশাপাশি দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের হলফনামায় প্রদর্শিত আয় নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি থেকে একের পর এক শীর্ষ নেতার বিদায় দলটির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। প্রশ্ন উঠেছে—দলে থাকা শীর্ষ নেতারা কেন এই ভাঙন ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরে জুলাই অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত যোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও আহতদের অনেকেই অভিযোগ করছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার সিদ্ধান্তের পর থেকেই এনসিপির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা ধারাবাহিকভাবে পদত্যাগ করছেন। দলটির একাংশ এ সিদ্ধান্তকে আদর্শবিরোধী ও রাজনৈতিকভাবে ‘আত্মঘাতী’ হিসেবে দেখছেন। ফলে কেউ কেউ প্রকাশ্য পদত্যাগ করছেন, আবার অনেকে নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। দলে থাকা শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও নিষ্ক্রিয়তা বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ক্ষোভ ও অভিমান প্রকাশ করে এনসিপির সব ধরনের পদ-পদবি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মুখপাত্র, যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন। তিনি পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ উইংয়ের কো-লিড হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই দিনে পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন।
শুক্রবার একাধিক এনসিপি নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সামনে আরো পদত্যাগের সম্ভাবনা রয়েছে। যারা পদত্যাগ করতে পারেন, তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালাচ্ছেন। ইতোমধ্যে পদত্যাগ করা শীর্ষ নেতাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, জুলাই অভ্যুত্থান ও ছাত্র-জনতার শহীদি রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত দলটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
এদিকে ১ জানুয়ারি রাতে পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনি দলের পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধানের দায়িত্বেও ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়াশোনা শেষে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা খালেদ সাইফুল্লাহ এনসিপি গঠনের পর থেকেই দলটির নীতিনির্ধারণী কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি ডা. তাসনিম জারার স্বামী। ডা. তাসনিম জারা ২৮ ডিসেম্বর এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি ঢাকা-৯ আসনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন এবং বর্তমানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন।
এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন বলেন, দলের ভেতরে মতবিরোধ চরমে পৌঁছেছে এবং তা প্রকাশ্য বিভক্তিতে রূপ নিয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি আসন সমঝোতা ও জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তের পর থেকেই অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে। তার ভাষায়, এনসিপি যে উদ্দেশ্য ও আদর্শ নিয়ে গঠিত হয়েছিল, দলটি এখন সেই জায়গায় নেই। নতুন ধারার রাজনীতির সম্ভাবনা ছেড়ে দিয়ে এনসিপি পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্যেই ঢুকে পড়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে গঠিত দলটির ওপর শহীদ পরিবার ও আহতদের বড় প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু যেভাবে দলটির ভেতরে সংকট ও পদত্যাগ বাড়ছে, তাতে আমরা আশাহত হচ্ছি। যে সাহসী মুখগুলো জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাই একে একে দল ছেড়ে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহীদ পরিবারের আরেক সদস্য বলেন, এনসিপির ভাঙন আমাদের প্রত্যাশাকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। সরকার পূর্বে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই বাস্তবায়ন করেনি, আর জুলাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত এনসিপির কাছ থেকেও আমরা কার্যকর সহযোগিতা পাচ্ছি না।
দলের একাধিক নেতার অভিযোগ, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এনসিপির ‘বিশেষ’ দুই শীর্ষ ব্যক্তির প্রভাবই ছিল সবচেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশকে উপেক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে অনেকেই নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। দলটির শীর্ষস্থানীয় এক নারী নেত্রী বলেন, তিনি পদত্যাগ না করলেও দলের সব কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। তার পদত্যাগ হলে কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নারী নেতৃত্বের বড় অংশ একযোগে সরে দাঁড়াতে পারেন বলেও জানান তিনি।
এখন পর্যন্ত এনসিপি থেকে অন্তত ১৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন—ডা. তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, আরিফ সোহেল, আজাদ খান ভাসানী, আসিফ নেহাল, মীর হাবিব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, মীর আরশাদুল হক, খালেদ সাইফুল্লাহ, খান মো. মুরসালীন, মুশফিক উস সালেহীন, ওয়াহিদুজ্জামান ও আল আমিন টুটুল। এছাড়া অনেক নেতা পদত্যাগ না করলেও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
ডা. তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীনের পদত্যাগের পর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘কেউ দলে থাকবে কিনা বা নির্বাচন করবে কিনা, তা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।’ ওই বক্তব্যের পর আরও প্রায় ১০ জন নেতা পদত্যাগ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, নতুন দল হিসেবে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ নিঃসন্দেহে বড় ক্ষতি। জামায়াতের সঙ্গে জোটকে শুধুমাত্র নির্বাচনি বিষয় বলা হলেও, পদত্যাগকারীরা সেই ব্যাখ্যায় আস্থা রাখতে পারছেন না। বিশেষ করে নারী নেতৃত্বের বড় একটি অংশ জামায়াতকে নিয়ে অনাস্থায় ভুগছেন। তিনি বলেন, এই ভাঙন ঠেকাতে না পারলে এনসিপি দ্রুত শক্তিহীন হয়ে পড়তে পারে।
