×

সাময়িকী

জীবনের দৌড় থেমে গেল ‘অনিমেষ’ স্রষ্টার

Icon

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনের দৌড় থেমে গেল ‘অনিমেষ’ স্রষ্টার
সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কৃত ‘কালবেলা’র কালজয়ী সৃষ্টিকর্তা পাড়ি দিলেন ‘কালপুরুষ’-এর দেশে। রেখে গেলেন আমার-আপনার মতন একাধিক অনিমেষকে। ‘অনিমেষ’ সিরিজের দ্বিতীয় উপন্যাস কালবেলা অর্থাৎ ‘ঞড়সড়ৎৎড়’ি। ৭০ দশকের উত্তাল বঙ্গ-রাজনীতির দৃশ্যপট হচ্ছে উপন্যাসটি। নকশাল আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে একাধিক উপন্যাস ও গল্প রচিত হলেও, ‘কালবেলা’ উপন্যাসটি যেন একটু অন্য বার্তা দেয়। ‘দেশ’ সাপ্তাহিকে ধারাবাহিক রূপে প্রকাশকালে এবং পরবর্তী সময়ে বই রূপে যখন প্রকাশিত হয়, সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারকে একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ‘কালবেলা’ কি রাজনৈতিক উপন্যাস? উনি বলেছিলেন- আমরা এক দারুণ অবিশ্বাসের কালে বেঁচে আছি। কেউ যদি বিশ্বাস করে ভুল করেন তবে তিনি আমাদের থেকে প্রাণবন্ত। অনিমেষরা যদি ভুলটা বুঝতে পেরে সঠিক পথটাকে খুঁজে পায় তা হলে কিন্তু ভুলটা মূল্যবান হয়ে যাবে। সেই কারণে ‘কালবেলা’ উপন্যাস সমকালীন রাজনৈতিক পরিবেশেও প্রাসঙ্গিক এবং প্রাঞ্জল। তাই ২০২৩ সালেও প্রশ্ন জাগে, ৭০ দশকের সেই দৃশ্যপট কি একটুও বদলেছে? শুধু আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। সেই তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমরা কেউ কাউকে স্বীকার এবং বিশ্বাস করতে পারি না। ভরদুপুরে নিজের ছায়া দেখা যায় না। অপরাহ্নকালে ছায়া যখন দীর্ঘতর হয় তখন তার আদল দেখে কায়াকে অনুমান করাও সহজ নয়। ছাত্র-রাজনীতি অনিমেষকে নিয়ে গেল জটিল আবর্তে। মানবিক মূল্যবোধের তাড়নায় সত্তরের আগুনে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে দগ্ধ করে অনুভব করল, দাহ্যবস্তুর কোনো সৃষ্টিশীল ক্ষমতা নেই। কিন্তু আজও আমরা তুচ্ছ কারণে হিংসা, দ্বেষ, আগুন নিয়ে মেতে উঠি। দেশ গড়ার জন্য বিপ্লবের নিষ্ফল হতাশায় ডুবে যেতে যেতে অনিমেষ আবিষ্কার করল বিপ্লবের আর এক নাম মাধবীলতা। একজন নারী কীভাবে তার বিশ্বাসকে ধরে রাখতে সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো মাধবীলতা। তাই সমরেশ মজুমদার ‘কালবেলা’ উপন্যাসকে আখ্যা দিয়েছিলেন ভালোবাসার উপন্যাস। দেশ, মানুষ এবং নিজেকে ভালোবাসার। মাধবীলতা যখন বিকলাঙ্গ অনিমেষকে ফিরিয়ে নিতে এসেছে, অনিমেষ বলে- তুমি জানো নিশ্চয়ই আমি হাঁটতে পারি না। জীবনে কখনো হাঁটতে পারব না। এক সন্তানের জননী কিন্তু অবিবাহিতা মাধবীলতার জবাব- জানি, জেনেই এসেছি। ট্যাক্সিতে বসে বেলগাছিয়ার বস্তিতে যাওয়াকালীন অনিমেষের স্মৃতিতে উঁকি মারে, লালবাজারে পুলিশের সম্মুখে শেষ দেখা সন্তান-সম্ভবা মাধবীলতাকে। বোলপুরে ক্ষণিকের উত্তেজনা, মাধবীলতার প্রয়োজনের সময় কলকাতা ছেড়ে উত্তরবঙ্গ চলে যাওয়া। দ্বিধাগ্রস্ত অনিমেষের একাধিক কৌতূহলী প্রশ্নের জবাবে মাধবীলতা জানায়, তুমি তো অনেক কিছু ভাবতে- দেশের কথা, অনেক মানুষের কথা, আমার মতো একটা সাধারণ মেয়ের কষ্টের কথা তুমি ভেবে নিতে পারবে না? এইখানেই এই উপন্যাসটিকে একটি অন্য মাত্রা দেয়। আলাদা মর্যাদা দেয়। হয়ে ওঠে এক কালজয়ী উপন্যাস। রাজনৈতিক মোড়কে অনেক প্রশ্নের ডালি নিয়ে উপস্থিত হয় এক ভালোবাসার উপন্যাস। বড় হতে গেলে ছোটবেলা হারাতে হয়। পুরোটা? হয়তো পুরোটা নয়। আমার মতন ষাট উত্তীর্ণ কিংবা ষাট ছুঁই ছুঁই প্রবীণরা, যাদের অনেকেরই শৈশব কেটেছে মফস্বল শহরে- ‘উত্তরাধিকার’ উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে তাদের শৈশবকালের জগৎ থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য করায়। আমার মতোন অনেকেই হয়তো ‘সরিৎশেখর’ চরিত্রটির মধ্যে নিজের দাদুকে খুঁজে পান। স্বর্গছেঁড়ার চা-বাগান, জলপাইগুড়ি পটভূমিকায় রচিত ‘উত্তরাধিকার’ উপন্যাসে যখন পড়ি ‘এই বাড়িটার চারপাশে শুধু গাছপালা। সবকয়টা গাছের আলাদা গল্প আছে, মন ভালো থাকলে দাদু সেগুলো বলেন। এই যে ঝাপড়া কাঁঠাল গাছ সারাদিন উঠোনের ওপর ছায়া ফেলে রাখে, সেটা বড় ঠাকুমা লাগিয়েছিলেন। চল্লিশ বছর হয়ে গেছে গাছটার।’ ঠিক সেরকমই শৈশবে আমি শুনেছিলাম আমার দাদুর কাছে, আমাদের বসতবাড়ির পুকুর পাড়ে যে কাঁঠাল গাছটা আছে- সেটা লাগিয়েছিলেন আমার ঠাম্মা। ‘উঠোনের শেষে গোয়ালঘর’, ‘সারাদিন রঙিন পাখির কিচিরমিচির’ কিংবা ‘গোয়ালঘরের পেছন দিকে কোনো বাড়িঘর নেই। বড় বড় জঙ্গলে গাছের সঙ্গে আম, কুল ছড়িয়ে আছে’ পড়তে পড়তে মনের পর্দায় ভেসে আসে- আমাদের বসতবাড়ির পেছন দিকে কলতলার পেছনের আমের বাগান, সেটা ছাড়িয়ে বামদিকে গেলে পুকুরের ডানদিকের বিশাল জমিতে আম, জাম, তেঁতুল গাছের সমারোহ। আমবাগানের শেষপ্রান্তে গোয়ালঘর। গাছের নিচে মাদুরের ওপর শুয়ে শুনতাম পাখ-পাখালির কিচির-মিচির, গরুর হাম্বা ডাক। অনিমেষ থাকে তখন জলপাইগুড়িতে দাদুর সঙ্গে। অনিমেষের মা-বাবা এসেছেন স্বর্গছেঁড়া থেকে, জলপাইগুড়ি বাড়ির গৃহপ্রবেশে। ‘একসময় একটু একলা পেয়ে মাধুরী ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁ রে, আমার জন্য তোর মন কেমন করে না?’ আর সঙ্গে সঙ্গে অনি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। ...অনি মাধুরীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।’ ‘উত্তরাধিকার’ উপন্যাসের এই অংশটি পড়ার সময় আমার মনে পড়ে যায়, মাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের কোলের ভিতর আমার মুখ গুঁজে কান্না- যখন মা দুর্গাপুজোর দশমীর দিন মুখে একগাদা সিঁদুর লাগিয়ে বসে ছিলেন লুকিয়ে রান্নাঘরের একপাশে সিঁড়ির-ঘরের কোনায়, অন্ধকারে। আমি কী মায়ের অভাববোধ করতাম সেইসময়, অনির মতন? ‘দাদুর সঙ্গে বসে খাওয়া অনির অভ্যেস। ...কাজ-করা উঁচু পিঁড়িতে বসে সরিৎশেখর খান, পাশেই ছোট মাপের পিঁড়িতে অনি।’ মনে করিয়ে দেয় দাদুর সঙ্গে বসে কাঁঠালগাছের পিঁড়িতে বসে খাওয়ার কথা। দাদুর আলাদা পিঁড়ি, কাঁসার থালা, গøাস, বাটি- আর আমি একটি ছোট পিঁড়িতে বসে দাদুর সঙ্গে। দাদু সবসময় আমার মাথায় দু’হাত রেখে বলতেন, ‘মানুষের মতন মানুষ হও। তোমার বিদ্যা, বুদ্ধি, বিবেকের জন্য আমি সর্বদা আশীর্বাদ করি দু’হাত ভরে।’ মনে পড়ে এ কথাটা আরো যখনই আমি পড়ি উত্তরাধিকারের সেই লাইনটি, যখন অনিমেষ জলপাইগুড়ি ছেড়ে কলকাতা যাচ্ছে কলেজে পড়তে, সরিৎশেখর এসেছেন স্টেশনে, অনিমেষের মাথায় দু’হাত রেখে বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছেন অনেক কিছু। অনিমেষ শুনতে পেল শেষ বাক্যটি, ‘বিদ্যা দাও, বুদ্ধি দাও, হৃদয় দাও।’ ‘উত্তরাধিকার’ উপন্যাসটি পড়ার সময় অনেক সময়ই মনে হতো, এটা কি লেখকের নিজের আত্মজীবনী! কিন্তু অবশ্যই উপলব্ধি হতো, অনেকাংশেই আমার শৈশবকালের কাহিনী। অনেকেরই হয়তো সেটা উপলব্ধি হয়েছে, আমার বিশ্বাস। এখানেই সমরেশ মজুমদারের সার্থকতা। পাঠককে একাত্ম করে দেয়া ওনার লেখনীর সঙ্গে। গল্প লেখার জন্য একজন লেখকের মানসজগতে যে কল্পবিশ্বের ভুবন নির্মিত হয়, সমরেশ মজুমদারের বেলায় সেটি গড়ে তুলেছিল উত্তর বাংলার শাল, শিমুলের সবুজ, চা বাগানের কুলি লাইন, স্বর্গছেঁড়া চা-বাগান, আংরাভাসা নদী, তিস্তার জলে ডুয়ার্সের ঘন সবুজের আড়ালে ডুবে যাওয়া সূর্যের অরুণ আভা। জলপাইগুড়ির আশপাশের তিস্তা-তোর্সা-করলা ছাড়াও সমরেশ মজুমদারের ‘সাতকাহন’, ‘গর্ভধারিণী’ এবং অন্যান্য উপন্যাসে, গল্পে ছড়িয়ে আছে জলদাপাড়া, হলং, গোরুমারা, ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ পাহাড়-জঙ্গলের সৌন্দর্য। এখন এসব শুধু স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে, ওনার সৃষ্টির মাধ্যমে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

১৭৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা

১৭৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা

যেসব কারণে নতুন কাঠামোতে বেতন পায়নি লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী

যেসব কারণে নতুন কাঠামোতে বেতন পায়নি লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী

মন্ত্রীদের ডাকলেন প্রধানমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীর বিদেশ সফর বাতিল

শ্রমিক অসন্তোষ মন্ত্রীদের ডাকলেন প্রধানমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীর বিদেশ সফর বাতিল

 চার দিন গ্যাসের স্বল্পচাপে ভুগবে সারা দেশ

চার দিন গ্যাসের স্বল্পচাপে ভুগবে সারা দেশ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App