কার ভুলে পাঠ্যবই বিতর্ক?
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য : সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে মানুষে মানুষে সাদৃশ্য ও ভিন্নতা অধ্যায়ে ‘শরীফার গল্প’ নামের গল্পটি পর্যালোচনা করার জন্য উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে পাঠ্যবই রচনার সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, না বুঝেই একটি গোষ্ঠী পাঠ্যবইয়ের বিরোধিতা করছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, শুধু ‘শরীফার গল্প’ই নয়, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ৪টি সামাজিক বিজ্ঞান ও ইতিহাস বই পর্যালোচনা করবে ওই কমিটি। এদিকে পাঠ্যবই থেকে ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি তুলে নিয়ে থার্ড জেন্ডার লিখলেও শিক্ষক গাইডে ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি উল্লেখ ছিল। গতকাল বুধবার সকালে শিক্ষক গাইড থেকেও শব্দটি পরিবর্তন করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড।
অভিযোগ রয়েছে, পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামানের নেতৃত্বে নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবই রচিত হয়। কিন্তু তড়িঘড়ি করে না দেখেই পাঠ্যবই ছাপিয়ে দেয়ায় নানা বিতর্ক হচ্ছে। সূত্রমতে, সপ্তম শ্রেণির যে বইয়ে ‘শরীফার গল্প’ নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে সেই বইয়ের শিক্ষক গাইডেও বিতর্কিত শব্দগুলো ছিল। শিক্ষক গাইডের তত্ত্বাবধানে ছিলেন পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের গবেষণা কর্মকর্তা এনামুল হক। তিনি না দেখেই মশিউজ্জামানের নির্দেশে বইটি ছাপতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। গতকাল ভোরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে এনামুল হক বলেন, মশিউজ্জামান স্যারের দোষ আমি দিতে পারব না। এতে স্যার বিপদে পড়ে যাবেন। তবে কার ভুলে এমনটি ঘটল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাফ করে দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন শিক্ষাক্রমের কাজ করার জন্য অভিজ্ঞদের নেননি অধ্যাপক মশিউজ্জামান। বরং যার সঙ্গে তার বনিবনা হতো না তাকেই অন্যত্র সরিয়ে দিতেন। সবশেষে বনিবনা না হওয়ায় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রধান সম্পাদক সন্তোষ ঢালীকে সরিয়ে দেন তিনি। ওই কর্মকর্তার মতে, মশিউজ্জামানের একগুঁয়েমি, খামখেয়ালিপনার কারণে পাঠ্যবইয়ে ভুল ও বিতর্কিত তথ্যে ভরা। এতে সরকার বিব্রত হয়েছে। গত ডিসেম্বরে সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী ও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ছাপাখানা থেকে তুলে এনে পাঠ্যবই দেখে না দিলে আরো সমস্যা হতো। এর দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না মশিউজ্জামান।
তিনি বলেন, গত বছরও তার কারণে পাঠ্যবই নিয়ে বিব্রত হয়েছে সরকার। এরপরে সামাজিক বিজ্ঞান ও ইতিহাস নামে দুটি বই প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। তবে
পাঠ্যবই প্রত্যাহারের পর দুটি তদন্ত কমিটি হয়। ওই কমিটির সুপারিশে যারা দায়ী বলে চিহ্নিত হয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, ৫ সদস্যের পর্যালোচনা কমিটিতে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুর রশীদকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গভর্নর মুফতি মাওলানা কফিল উদ্দীন সরকার, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) পরিচালক অধ্যাপক আবদুল হালিম এবং ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ।
প্রসঙ্গত, নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রণীত সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের একটি অধ্যায়ে হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক একটি পাঠ রয়েছে। এ নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক একটি অনুষ্ঠানে বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলার পর। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, পাঠ্যবইয়ে হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক পাঠ অংশের উপস্থাপনায় কোনো বিতর্ক বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়ে থাকলে এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করলে কিছুটা পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
বইয়ে শব্দটি ট্রান্সজেন্ডার নয়, থার্ড জেন্ডার আছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সেটি আইনত স্বীকৃত, যারা জৈবিক (বায়োলজিক্যাল) কারণে তৃতীয় লিঙ্গ বা সামগ্রিকভাবে সমাজে হিজড়া নামে পরিচিত। তারা এ দেশের নাগরিক। অবশ্যই তাদের নাগরিক সুবিধা আছে।
১৯ জানুয়ারি রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে ‘বর্তমান কারিকুলামে নতুন পাঠ্যপুস্তক : বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে আলোচনায় আসেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক আসিফ মাহতাব উৎস। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ওই সেমিনারে আসিফ মাহতাব অভিযোগ করেন, সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে আলোচনা করে শিক্ষার্থীদের ‘মগজধোলাই’ করা হচ্ছে। এ সময় তিনি সপ্তম শ্রেণির ওই বইয়ের ‘মানুষে মানুষে সাদৃশ্য ও ভিন্নতা’ অধ্যায়ের ‘শরীফার গল্প’ অংশের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেন। বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলা এবং ওই দিনের অনুষ্ঠানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। এরই মধ্যে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসে আসিফ মাহতাব দাবি করেন, এ ঘটনার পর তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে নিষেধ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, আসিফ মাহতাব গল্পটির ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গল্পের কোথাও ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি লেখা হয়নি, লেখা হয়েছে থার্ড জেন্ডার। এ গল্পের মাধ্যমে থার্ড জেন্ডার (হিজড়া) হিসেবে পরিচিত জনগোষ্ঠী যারা আছেন, তারাও যে মানুষ- এ বার্তা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এটা সৃষ্টির বৈচিত্র্য, এটাকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
এদিকে পাঠ্যবই ছিঁড়ে আলোচনায় আসা শিক্ষক আসিফ মাহতাবের সমর্থনে একদল শিক্ষার্থী ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিলেও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। গতকাল বুধবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে স্বাভাবিক ক্লাস-পরীক্ষা চলছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, কিছু শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জনের ডাক দিলেও পরে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তারা।
পাঠ্যবই ছিঁড়ে আলোচনায় আসা খণ্ডকালীন শিক্ষক আসিফ মাহতাবকে পুনর্বহালের দাবিতে গত মঙ্গলবার আন্দোলনে নামেন বিশ্ববিদ্যালয়টির কিছু শিক্ষার্থী। ‘ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস কমিউনিটি’র ব্যানারে ঢাকার মেরুল বাড্ডায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়ামের সামনে বিক্ষোভ করেন তারা। দিনভর বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসেন আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা। সেই আলোচনা ‘ফলপ্রসূ না হওয়ায়’ পরে তারা ক্লাস এবং ব্র্যাকের পণ্য বর্জনের ডাক দেন। তবে গতকাল বুধবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কোনো শিক্ষার্থীকে বিক্ষোভ বা আন্দোলনে দেখা যায়নি। বিক্ষোভ কর্মসূচির আহ্বায়ক ফ্রান্সিস ফরিদ বলেন, তারা ক্লাস বর্জন করেননি। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর শিক্ষার্থীদের একাংশ ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয়। কিন্তু আমরা ‘ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস কমিউনিটি’ ক্লাস বর্জন করিনি। যেহেতু শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, এ বিষয়ে কথা বলবেন, আমরা আমাদের আন্দোলন স্থগিত করেছি। তবে আমরা সমকামিতার বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব। সচেতনতা তৈরি করব।
কর্মসূচির নেতৃত্বে থাকা আরেক শিক্ষার্থী মুনতাসীর মামুন বলেন, কয়েকজন শিক্ষার্থী আলোচনা না করেই অতি উৎসাহী হয়ে মঙ্গলবার ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমরা যা বলার স্যারদের বলেছি, তারা আমাদের কথা শুনেছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, আমরা কেন ক্লাস বর্জন করব? ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মুখপাত্র গতকাল বলেন, ক্লাস-পরীক্ষা চলছে। ওরিয়েন্টেশনও হয়েছে।
