অপরিকল্পিত উন্নয়নে সংকুচিত হচ্ছে চলনবিল
মাজেম আলী মলিন, গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
একসময় বর্ষা এলেই দিগন্তজোড়া জলরাশিতে রূপ নিত চলনবিল। নদ-খালের প্রবাহে প্রাণ ফিরে পেত উত্তরাঞ্চলের এই বিশাল জলাভূমি। নৌকাই ছিল মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম, জেলেদের জালে ধরা পড়ত দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ, আর শীতকালে হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকত বিলাঞ্চল। সেই চিরচেনা চলনবিল এখন দ্রুত হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক রূপ। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নদ-খালের নাব্যতা হ্রাস, জলাভূমি ভরাট, নির্বিচারে পুকুর খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বৃহত্তম এই জলাভূমি আজ অস্তিত্বের সংকটে।
নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা চলনবিল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এর ভূমিকা অপরিসীম। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, চলনবিলের সুস্থতা উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশ ও অর্থনীতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
চলনবিলের আয়তন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত জরিপে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও একটি বিষয় নিয়ে দ্বিমত নেই—এর প্রাকৃতিক বিস্তৃতি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৮২৭ সালে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে স্থায়ী জলাভূমির আয়তন কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৮ বর্গকিলোমিটারে। বর্ষা মৌসুমে বিস্তৃতি প্রায় ১ হাজার ১৫০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত হলেও আগের সেই প্রাকৃতিক ব্যাপ্তি আর নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিলের বুক চিরে সড়ক নির্মাণ, অপরিকল্পিত কালভার্ট, জলাভূমি ভরাট, অবৈধ দখল, বসতি সম্প্রসারণ এবং নির্বিচারে পুকুর খননের কারণে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম ও নলডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক পুকুর খননের ফলে কৃষিজমি, প্রাকৃতিক জলাধার ও পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চলনবিলের প্রধান পানির উৎস বড়াল, গুমানী ও আত্রাই নদ। কিন্তু উজান থেকে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং পলি জমার কারণে বিলে আগের মতো পানি প্রবেশ করছে না।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পানাসি প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিল-সংলগ্ন ২১টি নদ-নদীর অধিকাংশই নাব্যতা হারিয়েছে। একইভাবে ৭১টি খাল-নালার প্রায় ৪১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মধ্যে প্রায় ৩৬৮ কিলোমিটার পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। এতে বর্ষার পানি ধারণ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্যের ওপর। দেশীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে, জলজ উদ্ভিদ ও অতিথি পাখির সংখ্যা কমছে এবং বিলকেন্দ্রিক জীবিকার ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জলবায়ুর স্বাভাবিক ভারসাম্যও বিঘ্নিত হচ্ছে।
সিংড়া চলনবিল পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, “অপরিকল্পিত উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট, নদ-খালের নাব্যতা হ্রাস এবং অবৈধ জালের ব্যবহারে চলনবিলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে। পরিবেশসম্মত পরিকল্পনার ভিত্তিতে উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।”
নাটোর বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “নিয়মিত নদী ও খাল পুনঃখনন, পলি অপসারণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে চলনবিলের হারানো সক্ষমতা অনেকাংশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাভূমি সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নদ-খাল পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল ও ভরাট বন্ধ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণের বিকল্প নেই।
চলনবিল শুধু একটি জলাভূমি নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই জলাভূমি টিকে থাকলে টিকে থাকবে অসংখ্য নদী, দেশীয় মাছ, অতিথি পাখি, উর্বর কৃষিজমি এবং লাখো মানুষের জীবন। তাই উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে সংকুচিত না করে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
