কাগজে-কলমে শ্রমিক, বাস্তবে খাল খনন চলছে এস্কেভেটরে
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ
কাগজ-কলমে প্রকল্পের কাজ শ্রমিক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বলে দেখানো হলেও বাস্তবে খাল খননের কাজ চলছে অবৈধভাবে এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন ব্যবহার করে। এতে একদিকে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নজরদারিতেই এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আর এ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে খাল খনন ও সংস্কার প্রকল্পের কাজে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী জনগুরুত্বপূর্ণ খালসমূহ খনন, পুনঃখনন এবং খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)-এর আওতায় এ উপজেলায় দুইটি খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদনসহ বরাদ্দ পায়।
দপ্তর সূত্র আরও জানায়, অনুমোদিত প্রকল্প এলাকায় অধিক পানি ও কৃষিজমি থাকায় বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্প দুটি সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে অনুযায়ী সংশোধিত খাল খনন ও পুনঃখননের অনুমতির জন্য প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়।
সংশোধিত প্রকল্প অনুযায়ী রামজীবন ইউনিয়নের ভবানীপুর ত্রাণের ব্রিজ হতে কে কৈ কাশদহ তালেরডিটা (কালিতলা) ল্যাংগা খাল পর্যন্ত ৭ হাজার ৫৫০ মিটার খাল খননের অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় ধরা আছে ২ কোটি ৬৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
এ ছাড়া শ্রীপুর ইউনিয়নের ডেলারায় মহাশ্মশান হতে দক্ষিণ শ্রীপুর সুইস গেট পর্যন্ত ৬ হাজার ৯০০ মিটার খাল খননের জন্য ২ কোটি ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুটি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫ হাজার টাকা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দুই প্রকল্প মিলে ১২ টি ভেকু খননের কাজ করছে। রামজীবন ইউনিয়নে ৮ টি এবং শ্রীপুরে ৪ টি। ২ প্রকল্পে পুরুষ-মহিলা মিলে ১ হাজার ২৬৪ জন শ্রমিক কাজ করার কথা রয়েছে। এরমধ্যে রামজীবন ইউনিয়নের প্রকল্পে ৬৬০ এবং শ্রীপুর ইউনিয়নের প্রকল্পে ৬০৪ জন। প্রকল্প দুটি ঘুরে কোথাও কোনো শ্রমিক দেখা যায়নি। তাঁদের নাম কেবলমাত্র তালিকায় দেখা গেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, শ্রমিক দিয়ে কাজ করার কথা শুনেছি। তালিকাও করা হয়েছে। এখন দেখছি ভেকু দিয়ে খনন চলছে। কাজ যে খুব একটা ভালো হচ্ছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। এসব খাল খননে জনগণের কোনো উপকারে আসবে না। শুধু অফিসারের পাকেট ভারি হবে বলে ধারণা তাঁদের। পাশাপাশি জামায়াত বিএনপির শ্রমিক ভাগাভাগির বিষয়টি নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকে।
রামজীবন ইউনিয়নের বাওনি খালের পাশের বাসিন্দা মহির উদ্দিনের স্ত্রী জামিরন বেগম (৬০) বলেন, “সাতটি ভেকু মেশিন দিয়া মাটি কাটার কাম চলছে। কোনো কামলাক কাম করতে দেখি নাই হামরা। হামরা গরীব মানুষ। হামাকগুলাক দিয়া কাম কইললে ভালোই হইলো হয়। কিন্তু গরিবের হক ওমরা এখন মারি খাইবে।”
খাল পাড়ের বাসিন্দা সুনীল চন্দ্র দাশ (৯০) বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে জীবন-জীবিকার অবলম্বন এ খালটি। এক সময় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছ এখন অনেক কমে গেছে। সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান তিনি। তবে ভেকু দিয়ে খনন করায় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।”
এ বিষয়ে কথা হয় শ্রমিকের তালিকায় নাম থাকা মো. আনিছুর রহমান ও মো. আবু বক্কর সিদ্দিকসহ আরও কয়েকজনের সাথে। তারা বলেন, “শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার কথা বলে মাসখানেক আগে ভোটার আইডি ও মোবাইল নাম্বার নিয়েছেন। এর বেশিকিছু জানেন না তারা।”
এ বিষয়ে শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আজাহারুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, "ভেকু দিয়ে মাটি খননের কাজ চলছে। পরে শ্রমিক দিয়ে করা হবে। এখানে চারটি ভেকু কাজ করছে। ইউএনও স্যারসহ আমিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি।"
রামজীবন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো, শামছুল হুদা সরকার ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, "আমাকে একদিন এমপি মহোদয় এবং পিআইও ডেকেছিলেন এ বিষয়ে। বলেছিলেন শ্রমিক লাগবে মোট ৬৬০ জন। এরমধ্যে বিএনপি দিবে ১২৫, জামায়াত দিবে ১২৫, এমপি মহোদয় দিবেন ৭৫ জন শ্রমিক। বাকি ৩৩৫ জন শ্রমিক আমার কাছে চেয়েছিলেন। তালিকাও করেছি। কিন্তু তারা আর তালিকা নেননি। এখন দেখছি তারা খাল খননের কাজ ভেকু দিয়েই করছেন।"
এ প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার দপ্তরে কয়েকবার গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মো. বাবুল আহমেদ ক্ষোভের সাথে বলেন, "খাল খননের বিষয়ে ইউএনও বা পিআইও বিস্তারিত কিছুই বলেননি আমাদের। রামজীবন এবং শ্রীপুর ইউনিয়ন থেকে ১২৫ করে ২৫০ জন শ্রমিকের নাম চেয়েছেন মাত্র।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, "এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন এবং শ্রমিক দু'টো দিয়েই কাজ করার অনুমতি নেয়া আছে। এখন ভেকু দিয়ে করা হচ্ছে। পরবর্তীতে শ্রমিক দিয়ে বাকি কাজগুলো করা হবে।" অপর এক প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, "খনন হওয়া খালের দু'ধারের হতদরিদ্ররাই শ্রমিক হিসেবে কাজ করবেন। অন্য এলাকার নয়।"
