ধরলার ভাঙনে ঘর হারানোর আতঙ্কে বুড়িমারীর মানুষ
এস আই সবুজ, পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম
ছবি : ভোরের কাগজ
ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্ত দিয়ে বুড়িমারী জিরোপয়েন্টের পাশ দিয়ে প্রবাহিত আন্তঃসীমান্ত ধরলা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী স্থলবন্দর সংলগ্ন ধরলা নদীপাড়ের শত শত পরিবার। ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায় অনেকেই কাটাচ্ছেন নির্ঘুম রাত।
চলতি বর্ষা মৌসুমের আগেই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে নদীতীরবর্তী ফসলি জমি ও গাছপালা। যাদের বসতভিটা এখনো টিকে আছে, তারাও যেকোনো সময় ঘরবাড়ি ও জমি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন পার করছেন। এরই মধ্যে স্থানীয় স্কুল, মসজিদ, কবরস্থানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, নদীভাঙন রোধ এবং ধরলার নাব্যতা পুনরুদ্ধারে দ্রুত স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে একটি পুরো গ্রাম। একই সঙ্গে ব্যাহত হতে পারে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বুড়িমারী স্থলবন্দরের কার্যক্রম।
সরেজমিনে দেখা যায়, জিরোপয়েন্ট বাঁধের পাড় থেকে নুর ইসলাম মিস্ত্রির বাড়ি পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শত শত বাড়ি ধরলার তীব্র ভাঙনের কবলে রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে উৎপন্ন ধরলা নদী চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে প্রবেশের পর নদীটি বাঁক নিয়ে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে নদীর উত্তর-দক্ষিণ অংশে তীব্র ভাঙনে বিলীন হচ্ছে নদীতীরবর্তী আবাদি জমি। ধরলার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় একটি কবরস্থানও।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৯৪ সালে ধরলা নদীর পশ্চিম তীরের কিছু অংশে তীর সংরক্ষণ কাজ করেছিল। ওই সময় পাথরের ব্লক ও বস্তা দিয়ে নদীর পশ্চিম তীর রক্ষা করা হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৯৪ সালের পর থেকে প্রতিবছর এই এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিলেও স্থায়ী কোনো বাঁধ বা কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে নদীর নাব্যতা রক্ষায় খনন এবং ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের মতো কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।
তাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে মাটি উত্তোলন এবং বর্ষায় পানির স্রোত বাড়লে ধরলার তীব্র বাঁকে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফলে নদীপাড়ের মানুষ প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, "ধরলার গর্ভে আমার আবাদি জমি চলে গেছে। এখন শেষ সম্বল বাড়িটিও যদি ভেঙে যায়, তাহলে আমরা কোথায় যাবো জানি না।"
আরেক কৃষক বকুল মিয়া বলেন, "২১ শতক জমি হারিয়ে আমি নিঃস্ব। এই ক্ষতিপূরণ দিবে কে? সরকারকে অনুরোধ জানাই, আমার মতো আর কেউ যেন এই ভাঙনের শিকার না হয়।"
ধরলা নদীর অংশে গড়ে ওঠা আম বাগানের মালিক মেহেদী হাসান নাইম বলেন, "ধরলার বুকে ১.৫ একর জমিতে হাড়িভাঙ্গা আম বাগান রয়েছে। নদী খনন না করার কারণে আম বাগানের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না।"
বুড়িমারী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাজেদুল হুদা সিয়াম বলেন, "নদীপাড়ের মানুষের এই আর্তনাদ ও ভাঙনের ঝুঁকি নিরসনে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনুরোধ জানাচ্ছি। সরকারের পালাবদল হয়, কিন্তু বুড়িমারীর এই অংশে নদীভাঙনের শিকার মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।"
এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষতিগ্রস্তরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ডাম্পিং এবং স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করলেও স্থায়ী কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।
বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তফা হাসান ইমাম বলেন, "জিরোপয়েন্ট বাঁধের পাড়ে ধরলা নদীর অংশটি মনিটরিং করা হয়েছে। নদীর ভাঙন রোধ এবং নদীতীর সংরক্ষণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই পানি উন্নয়ন বোর্ড ধরলা নদীর ভাঙন রোধে সিসি ব্লক নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।"
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার বলেন, "পাটগ্রামের ধরলা নদীর অংশে ভাঙন রোধ ও নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজের জন্য আমাদের কারিগরি টিম পরিদর্শন করেছে। প্রকল্পের অনুমোদন পেলেই বাঁধ সুরক্ষায় জিও ব্যাগ ডাম্পিংসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।"
