আড়াই বছর ধরে আটকে শত কোটি টাকার ৯ সেতুর কাজ, জনদুর্ভোগ চরমে
হাবিবুর রহমান হবি, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
গাইবান্ধায় প্রায় আড়াই বছর ধরে ১০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিতব্য নয়টি সেতুর কাজ আটকে আছে। এর মধ্যে চারটির কাজ শুরুই হয়নি এবং পাঁচটির কাজ মাঝপথে বন্ধ রয়েছে। এতে জনগণের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় সেতুগুলোর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণকাজে এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকারের বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হবে।
গাইবান্ধা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ‘জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিদ্যমান বেইলি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন (রংপুর জোন)’ প্রকল্পের আওতায় জেলার তিনটি প্যাকেজে মোট ১১টি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ৬৮০.৭৩ মিটার এবং প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১১৬ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।
ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মঈন উদ্দিন বাসি লিমিটেড’-এর অধীনে প্রথম প্যাকেজে দুটি সেতু রয়েছে (মোট দৈর্ঘ্য ২৪৩.৪৯ মিটার, ব্যয় ২৬ কোটি ৫৮.৫২ লাখ টাকা)। ২০২২ সালের ২ অক্টোবর কাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। এর মধ্যে কেবল পলাশবাড়ী-ঘোড়াঘাট সড়কের করতোয়াপাড়া সেতুটির কাজ সম্পন্ন হওয়ায় সেটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, সাদুল্লাপুর-নলডাঙ্গা সড়কের জামুডাঙ্গা (ঘাঘট-৩) সেতুর পিলার ও পাটাতনের (স্ট্রাকচার) কাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক নির্মিত হয়নি।
ঢাকার ‘মেসার্স মাসুদ হাইটেক’-এর অধীনে দ্বিতীয় প্যাকেজে ছয়টি সেতু ধরা হয় (মোট দৈর্ঘ্য ২৯৭.৬০ মিটার, ব্যয় ৬২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা)। ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি শেষ হওয়ার মেয়াদ নির্ধারিত ছিল। এর মধ্যে জেলা শহরের নিউ ব্রিজ রোড (ঘাঘট-২) ও গোবিন্দগঞ্জের শাকদহ সেতুর কেবল পিলার ও পাটাতন সম্পন্ন হয়েছে; কিন্তু সংযোগ সড়ক করা হয়নি। মাঠেরহাটে কেবল পাইলিংয়ের কাজ শেষ করে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া বাজারপাড়া, হলহলিয়া ও কদমতলি—এই তিনটি সেতুর কাজ এখনো শুরুই করা যায়নি।
‘হাসান টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড’ ও ‘আমিনুল হক’-এর যৌথ উদ্যোগে তৃতীয় প্যাকেজে তিনটি সেতু রয়েছে (মোট দৈর্ঘ্য ১৩৯.৬৩ মিটার, ব্যয় ২৬ কোটি ৯৬.৭০ লাখ টাকা)। ২০২২ সালের ২ নভেম্বর কাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর মেয়াদের সময়সীমা ছিল। এর মধ্যে সাঘাটার বাজিতনগরে সম্প্রতি কাজ শুরু হয়েছে এবং শহরের পুলবন্দি সেতুর পিলার ও পাটাতন শেষে সংযোগ সড়ক ছাড়াই ফেলে রাখা হয়েছে। কালিতলা এলাকায় সেতুর কাজ শুরুই হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, শাকদহ, পুলবন্দি, নিউ ব্রিজ ও জামুডাঙ্গায় নতুন সেতুর অবকাঠামো তৈরি হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় লোহায় মরিচা ধরেছে এবং সেতুর মুখ ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে। গোবিন্দগঞ্জের শাকদহ এলাকার বাসিন্দা ফারুক হোসেন ও স্থানীয় শিক্ষক এমদাদুল হক জানান, নতুন সেতুর কাজ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে জরাজীর্ণ পুরনো সেতু দিয়েই ঝুঁকিপূর্ণভাবে পারাপার হতে হচ্ছে। রাতের আঁধারে নতুন সেতুর রড চুরির ঘটনাও ঘটছে।
গাইবান্ধা শহরের ট্রাকচালক আশরাফুল আলম ও অটোচালক চান মিয়া জানান, শহরের গুরুত্বপূর্ণ নিউ ব্রিজ ও পুলবন্দি সেতু চালুর অপেক্ষায় থাকা সত্ত্বেও পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে চলাচলের কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়াস কুমার সেন জানান, মূলত ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে ১১টির মধ্যে চারটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ৩ জুন ভূমি অধিগ্রহণের ৭ ধারা নোটিশ জারি হয়েছে। বর্তমানে প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) প্রস্তুতের কাজ চলছে। এটি শেষ হলে ৮ ধারা নোটিশ ও ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান করা হবে। এরপরই বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন সম্ভব হবে। এছাড়া অসমাপ্ত সেতুগুলোর মেয়াদ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
কাজের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে জানতে প্রথম প্যাকেজের ঠিকাদার মঈন উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।
