ত্যাগ, শোক ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক, পবিত্র আশুরার ইতিহাস
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১১:০৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
মহররম শব্দের অর্থ নিষিদ্ধ বা সম্মানিত। আর ‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ দশম। অর্থাৎ মহররম মাসের ১০ তারিখই হলো পবিত্র আশুরা। অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে লড়াই, কারবালার প্রান্তরে নবী পরিবারের আত্মত্যাগ এবং ইসলামের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া একাধিক অলৌকিক ও ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই দিনটি। বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ এই দিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালন করে থাকে।
কারবালার ঘটনার বহু আগে থেকেই ইসলামের ইতিহাসে আশুরার দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতময় ছিল। ইসলামিক বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, এই ১০ই মহররমের দিনে মহান আল্লাহ তায়ালা বহু ঐতিহাসিক ঘটনার অবতারণা করেছেন।
সৃষ্টির সূচনা ও কিয়ামত: এই পবিত্র দিনে মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে বলে ইসলামে বিশ্বাস রয়েছে।
হযরত আদম (আ.)-এর তাওবা কবুল: আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-কে এই দিনে পৃথিবীতে প্রেরণ এবং দীর্ঘ ক্রন্দনের পর তাঁর তাওবা কবুল করা হয়েছিল।
নূহ (আ.)-এর প্লাবন থেকে মুক্তি: মহাপ্লাবনের পর হযরত নূহ (আ.)-এর কিশতি বা নৌকা এই দিনে জুদি পাহাড়ে এসে স্থির হয়েছিল।
হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মুক্তি: নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে এই দিনে মুক্তি পেয়েছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)।
হযরত মুসা (আ.) ও বনী ইসরাইলের মুক্তি: ফেরাউনের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে হযরত মুসা (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে লোহিত সাগর পার হয়েছিলেন এবং এই দিনেই ফেরাউন তার দলবলসহ সাগরে ডুবে মারা যায়।
এই বিজয়ের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হযরত মুসা (আ.) এবং পরবর্তীতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখতেন এবং মুসলমানদের (৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মহররম) রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইসলামের ইতিহাসে পূর্ববর্তী সব ঘটনাকে ছাপিয়ে আশুরার দিনটি এখন সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় ৬১ হিজরির (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্য।
তৎকালীন উমাইয়া শাসক ইয়াজিদের অন্যায়, জুলুম এবং ইসলাম পরিপন্থী শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) এবং ফাতেমা (রা.)-এর কনিষ্ঠ পুত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.)। ইয়াজিদের আনুগত্য (বাইয়াত) স্বীকার না করে তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেন।
ইমাম হোসেন (রা.) তার পরিবার ও অনুসারীদের নিয়ে মদিনা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হলে ইরাকের ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনী তাঁদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। পানি বন্ধ করে দেওয়া হয় নবী পরিবারের জন্য। অবরুদ্ধ অবস্থায় ১০ই মহররম ইয়াজিদের বিশাল ও সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্র ৭২ জন সঙ্গী নিয়ে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন ইমাম হোসেন (রা.)।
একে একে তার পরিবারের সদস্য এবং প্রিয় সন্তানরা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন। পরিশেষে, মোনাজাতের সিজদারত অবস্থায় ইয়াজিদ বাহিনীর শিমারের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন মহানবীর (সা.) প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.)।
কারবালার এই ঘটনা কেবল একটি শোকের ইতিহাস নয়, এটি অন্যায়, স্বৈরাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাথা নত না করার এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা। ইমাম হোসেন (রা.) জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে, সংখ্যার দিক থেকে দুর্বল হলেও সত্যের পথে অবিচল থাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই একজন প্রকৃত মুমিনের আদর্শ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আশুরা উদযাপিত হয়।
শিয়া সম্প্রদায়ের শোক প্রকাশ: শিয়া মুসলমানরা কারবালার এই শোককে স্মরণ করে 'তাজিয়া মিছিল' বের করেন, যেখানে মাতম ও শোকের আবহে "হায় হোসেন, হায় হোসেন" ধ্বনিতে কারবালার স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ঢাকার হোসাইনি দালান ইমামবাড়া থেকে প্রতিবছর ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল বের হয়।
সুন্নি মুসলমানদের আমল: সুন্নি মুসলমানরা এই দিনে নফল রোজা রাখেন, কারবালার শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া, মিলাদ মাহফিল এবং গরিব-দুঃখীদের মাঝে উন্নত খাবার বা খিচুড়ি বিতরণ করে থাকেন।
পবিত্র আশুরা মুসলিম উম্মাহর জন্য একই সাথে আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বার্তা নিয়ে আসে। কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সত্য প্রতিষ্ঠা করাই হোক এই দিনের প্রকৃত অঙ্গীকার।
