একাত্তরের ২০ মে চুকনগর গণহত্যা
পাকবাহিনীর নৃসংসতার চূড়ান্ত উদাহরণ
মাহিদুল হোসেন সানি
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম
ছবি: একাত্তরের ২০ মে চুকনগর গণহত্যা, পাকবাহিনীর নৃসংসতার চূড়ান্ত উদাহরণ
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যাগুলোর মধ্যে ‘চুকনগর গণহত্যা’ একটি বিশেষ মর্মান্তিক এবং ব্যাপকতার দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়। এটি ইতিহাসের সেইসব ঘটনার একটি, যা পাকিস্তানি বাহিনীর পরিকল্পিত ও নৃশংস গণহত্যার চূড়ান্ত উদাহরণ।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) জুড়ে নির্বিচার গণহত্যা শুরু করে। বিশেষ করে বাংলার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় এবং মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের ওপর নিপীড়ন চূড়ান্ত আকার ধারণ করে। এপ্রিল ও মে মাস নাগাদ খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ফরিদপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অসংখ্য বাঙালি প্রাণ বাঁচাতে ভারতে পালাতে শুরু করে। তাদের জন্য একটি প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট ছিল খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজার।
ভৌগোলিক কারণে এই অঞ্চলটি শরণার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চুকনগর বাজার ভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত, যা খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা এবং ভারতের কাছে যাওয়ার একটি সহজ পথ। গণহত্যার প্রাক্কালে, অর্থাৎ ১৮-১৯ মে এর মধ্যে, চুকনগর ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার শরণার্থী জড়ো হয়েছিল, যাদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু।
১৯৭১ সালের ২০ মে বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় ১০টার দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি দল দুইটি ট্রাক ও একটি জিপ গাড়িতে করে চুকনগরে এসে পৌঁছায়। বাহিনীটি তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে মালোপাড়া-রায়পাড়া, বাজার এলাকা এবং ভদ্রা নদীর পাড়ে অগ্রসর হয় এবং নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে।
প্রত্যক্ষদর্শী সিরাজুল ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী, হতবিহ্বল মানুষেরা প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিকে পারে ছুটতে থাকে। কেউ গাছে ওঠে, কেউ নৌকার নিচে লুকায়, আবার কেউ কেউ ধানখেত ও পাটখেতের ঝোপে আশ্রয় নেয়। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা তাদের কোনো রেহাই দেয়নি। এই গণহত্যা প্রায় বিকেল পর্যন্ত চলে এবং পুরো চুকনগর এলাকাজুড়ে লাশের স্তূপে পরিণত হয়।
সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্মৃতিচারণ করে সুশীলা বৈরাগী নামের একজন বয়োবৃদ্ধা প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, ‘মিলিটারি গুলি শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও দৌড় দিলাম। ভাসুরের বুকে গুলি লাগল, সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢলে পড়লেন। ধরাধরি করে তাকে একপাশে সরিয়ে আনতেই দেখি, আমার স্বামী আর ছেলেও গুলি খেয়ে পড়ে আছে। ভাসুরকে ছেড়ে যখন স্বামীর কাছে এলাম, দেখি তিনি আর বেঁচে নেই। তখন পাশে শুয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখি, সে-ও মরে গেছে। তখন কে যে কাকে ধরবে, কারও কোনো হুঁশ নেই। সবাই নিজের প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে। যেদিকে তাকাই শুধু লাশ আর লাশ।’
হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে ভদ্রা নদীর পানি লাল হয়ে যায় এবং লাশের স্তূপে নদীর স্রোত থমকে দাঁড়ায়। নিহতদের লাশের সঠিক সমাধিও দেওয়া সম্ভব হয়নি; পাকিস্তানি বাহিনী অনেক লাশ নদীতে নিক্ষেপ করে।
এই গণহত্যা কেবল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একাই চালায়নি; তাদের সহায়তা করেছিল এ দেশীয় দোসর বাহিনী রাজাকার ও আলবদররা। রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফ। তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নির্যাতন ও লুণ্ঠন চরম আকার ধারণ করে। চুকনগরের গণহত্যার পরের দিন (২১ মে) বাগেরহাটের রামপালের ডাকরা এলাকাতেও অনুরূপ গণহত্যা চালানো হয়, যেখানে রাজাকার বাহিনী প্রায় ৭০০-২০০০ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে।
চুকনগর গণহত্যা পৃথিবীর ইতিহাসে স্বল্প সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ হত্যার একটি নৃশংস ঘটনা। সরকারি পরিসংখ্যান ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১২ হাজারের মধ্যে। চুকনগর কলেজের অধ্যক্ষ ও গণহত্যা-৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সভাপতি এ বি এম শফিকুল ইসলাম এই গণহত্যাকে ‘বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তম গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ভিয়েতনামের মাই লাই গণহত্যার থেকেও অনেক বড় (সেখানে নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১,৫০০)।
তবে, ক্যামব্রিজের অধ্যাপক সর্মিলা বসে তার বই "Dead Reckoning: Memories of the 1971 Bangladesh War" (২০১১)-এ এই হিসাবকে ‘অসহায়’ আখ্যা দিয়ে বিতর্ক তৈরি করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, যতসংখ্যক আক্রমণকারী ছিল, তাদের কাছে শুধুমাত্র কয়েকশ মানুষ হত্যার জন্য গোলাবারুদ ছিল, ১০,০০০ জন হত্যা সম্ভব নয়। তবে এই মতামত অনেক ঐতিহাসিক ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনার বিপরীতে গেছে এবং ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। অনেকের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে গুলি চালানো এবং ঘাঁটিঘাঁটি পরিবর্তন করে এত সংখ্যক মানুষ হত্যা সম্পূর্ণ সম্ভব ছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে এই গণহত্যার ব্যাপক আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি, বরং পরবর্তী সময়ে এটিকে ‘অবহেলিত গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চুকনগর গণহত্যার শিকারদের স্মরণে দাবি উঠেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির। ২০২২ সালের মে মাসে ঢাকা ও খুলনায় ৫১তম বার্ষিকী পালনের সময় সংগঠক ও আইনজীবীরা জেনেভা কনভেনশনের সামনে এই গণহত্যার প্রমাণ উপস্থাপন করে বিচারের দাবি জানান।
প্রতি বছর ২০ মে বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন চুকনগর গণহত্যা দিবস পালন করে। দিবসটি উপলক্ষে স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ, শোক র্যালি, আলোচনা সভা ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি পালিত হয়। নিহতদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে চুকনগরে ‘চুকনগর শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালে গণপূর্ত বিভাগ সাত লাখ টাকা ব্যয়ে এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণ করলেও, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবি অধরাই থেকে গেছে। বক্তারা এখনও রাষ্ট্রীয়ভাবে ২০ মে ‘জাতীয় শোক দিবস’ বা ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছেন।
চুকনগর গণহত্যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালের ২০ মে খুলনার চুকনগরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার বাহিনীর চালানো এই হত্যাযজ্ঞ শুধু একটি গণহত্যাই নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে যেখানে দশ হাজারের বেশি নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, সেখানে সেই ইতিহাসের যথাযথ স্বীকৃতি ও স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হতে পারে। চুকনগরের বধ্যভূমি আমাদের সকলকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতার পেছনে কত বড় আত্মত্যাগের ইতিহাস রয়েছে, আর সেই ইতিহাসকে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
লেখক: সাংবাদিক
