×

বিশেষ সংখ্যা

পহেলা বৈশাখ: বাঙালির উৎসবের শিকড়

Icon

প্লাবন রায়

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৭ পিএম

পহেলা বৈশাখ: বাঙালির উৎসবের শিকড়

পহেলা বৈশাখ: বাঙালির উৎসবের শিকড়

বছরের প্রথম দিনের প্রথম সকালে জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই যেন শুরু হয়ে যায় বাঙালির পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ শব্দটা কেবল তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এটি বাঙালির সংস্কৃতি, বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গিয়েছে। আজ বাংলা সনের প্রথম দিন। এই বাংলা সন সৃষ্টির নেপথ্যে একটা গল্প আছে। দিল্লীর সিংহাসনে তখন সম্রাট আকবর। সেসময় খাজনা আদায় করা হতো হিজরি সাল মেনে। এদিকে হিজরি সাল হিসাব করা হয় লুনার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। লুনার ক্যালেন্ডার হলো চাঁদের আবর্তনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি দিনপঞ্জি। অর্থাৎ চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে যে সময় নেয় তাকে এক চান্দ্রমাস ধরা হয়।

হিজরি মাসের শুরু হয় নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে। যে কারণে হিজরি মাসের দিন সংখ্যা সৌর মাসের তুলনায় কম থাকে। সৌর ক্যালেন্ডারের চেয়ে চান্দ্র ক্যালেন্ডার তাই প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন এগিয়ে যায়। এদিকে বাংলার কৃষকরা চাষাবাদ করে নির্দিষ্ট মৌসুম অনুযায়ী। যেকারণে প্রতি বছর ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে হিজরি নববর্ষের মিল থাকতো না। এর প্রভাব গিয়ে পড়লো খাজনা আদায়ে । যখন খাজনা দেওয়ার সময় আসে, তখন অনেক সময় তাদের ঘরে ফসলই উঠতো না। সেসময় এমন এক সময়পঞ্জির প্রয়োজন পড়লো যা কৃষকের ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ। 

সম্রাট আকবরের দরবারের জ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজীর ওপর গিয়ে পড়লো এই দায়িত্ব। সম্রাটের নির্দেশে তিনি সৌর বছরের হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে 'তারিখ-এ-এলাহি' বা ফসলি সন উদ্ভাবন করেন। ধীরে ধীরে সেটিই রুপ নেয় আজকের বাংলা সনের। গল্পটা যেসময়কার, ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তখন ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ। কিন্তু সম্রাট চাইলেন তার সিংহাসনে বসার বছর থেকেই যেন নতুন বাংলা সন হিসাব করা হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সম্রাট আকবর সিংহাসনে বসেন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ আর হিজরি সালের হিসাবে ৯৬৩। আকবর নিয়ম করলেন ওই বছরের পর থেকে হিজরি সনের চান্দ্র গণনা বাদ দিয়ে সৌর গণনা শুরু হবে। ফলে ৯৬৩ হিজরি থেকেই বাংলা ৯৬৩ সন শুরু হয়। এরপর থেকে রইলো না কোনো খাজনা আদায়ের ঝক্কি। প্রশাসনিক প্রয়োজনে জন্ম নেওয়া দিনটি কালক্রমে বাঙালির প্রাণের উৎসব হয়ে উঠলো।

পহেলা বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মূলত একটি সমাজ বা জাতির জীবনধারা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা, শিল্পকলা, রীতি-নীতি ও চিন্তাভাবনার সমষ্টিই হলো সংস্কৃতি। মোঘল আমলের সেই খাজনা পরিশোধের রীতি থেকে শুরু হয়ে কালের বিবর্তনে এসে তা থেমেছে দোকানের হালখাতায়। নববর্ষের দিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় থাকে হালখাতার আয়োজন। দোকানিরা পুরোনো বছরের মলিন হয়ে যাওয়া খাতা পালটে লাল কাপড়ে মোড়ানো নতুন হিসাবের খাতা শুরু করে।  গতবছরের দেনাপাওনা পরিশোধ ও নতুন খাতা খোলার এই আয়োজনও উৎসবমুখর হয়ে উঠে প্রতিটি দোকানে। 

সময়ের দীর্ঘপথ পরিক্রমা করে পহেলা বৈশাখ হয়ে উঠেছে  বাঙালিদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অংশ, হয়ে উঠেছে বাঙালির উৎসব। সময়ের ব্যবধানে এই উৎসবেও যুক্ত হয়েছে নানান আয়োজন। যার অন্যতম উদাহরণ বৈশাখী মেলা। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত এই মেলা গ্রাম থেকে শহর সব জায়গায় বিস্তৃত ছিল। কালক্রমে বৈশাখী মেলাও তার রূপ বদলেছে।  আজ থেকে একযুগ আগেও বৈশাখী মেলার রূপ ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। মেলার মাঠ ভরে থাকতো লোকজ পণ্যের নানান সমাহারে। সেখানে থাকতো মাটির তৈরি টেপা পুতুল, বাঁশ বা বেত দিয়ে তৈরি গৃহস্থলী জিনিসপত্র, খাবারের দোকানে পাওয়া যেত বিন্নী ধানের খই, চিনির সাজ, চিড়া, মুড়ি, বাতাসা, বাহারী পিঠা। সেসময়কার বৈশাখী মেলার আরো এক আকর্ষণ ছিল নাগর দোলা। নাগর দোলায় থাকতো বাহারী রঙ, যা মেলার মাঠে খুব দূর থেকেও দৃষ্টিগোচর হতো। পাশাপাশি পুতুল নাচ মেলায় আগত দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। যে পুতুল নাচের মধ্যে দিয়ে উঠে আসতো গ্রাম বাংলার যাপিত জীবনের সুখদুঃখের গল্পকথা।  কতক জায়গায় বৈশাখীমেলায় বাউল গান, পালা গানের আসরও বসতো।

কালক্রমে মেলার সেই পালাগান গিয়ে ঠেকেছে বৈশাখী কনসার্টে। কারুশিল্পের দোকান কমে গিয়ে জায়গা দখল করছে আধুনিক ফ্যাশন পণ্য। বৈশাখী মেলা তার আগের সেই রূপ একটু একটু করে পাল্টে নিচ্ছে মানুষের জীবনযাপনের ধরণের সঙ্গে মিল রেখে। তবে আশার কথা হলো, এখনো এই দিনটা এলে এ দেশের মানুষ তার বাঙালি সত্তাটাকে নতুন করে খুঁজে পায়। ইট পাথরের ব্যস্ত নগরীর মানুষগুলোও খুঁজতে চেষ্টা করে তার শেকড়টাকে। তাইতো বৈশাখী আয়োজনে স্টল বসে পান্তা ইলিশের। সেখানে বৈশাখী সাজে মানুষ ভিড় জমায় পান্তা ইলিশ খেতে। একদিনের এই বাঙালিয়ানা নিয়ে অনেকে নাক সিটকালেও এর ভালো দিকও আছে । জীবনের তাগিদে কর্পোরেট দুনিয়ায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়া মানুষগুলো এই একটা দিনে তার শিকড়ের সন্ধান করে।পহেলা বৈশাখ তাই বাঙালির আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার একটি দিন।

অবশ্য এ কথাও সত্য বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা কেবল বিশেষ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে ধারণ করতে হবে প্রতিদিনের যাপিত জীবনে। পাশাপাশি যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাংলা সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে, বাংলা সংস্কৃতির চর্চা করে তাদেরও যথেষ্ট মূল্যায়ন করতে হবে। তবে হতাশার কথা, সাম্প্রতিক সময়ে এর উল্টোচিত্র চোখে পড়ছে। ধর্ম ও রাজনীতির মোড়কে আবদ্ধ করে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চার পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে খুব সুকৌশলে। এই অপরাজনীতির বলি হচ্ছে বিভিন্ন বাংলা শব্দ। সমসাময়িক ঘটনাবলীর বিবেচনা প্রসঙ্গে উঠে আসে মঙ্গল শোভাযাত্রার কথা। এই শোভাযাত্রার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ভুলে নাম পরিবর্তনের এক নোংরা রাজনীতি শুরু হয়েছে দেশ জুড়ে।

বাংলা নববর্ষের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক আয়োজন এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, শহর এমনকি গ্রামাঞ্চলেও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের র্যালি ও শোভাযাত্রা বের হয়। মানুষ আনন্দের সঙ্গে এই শোভাযাত্রা উদযাপনের মধ্যে দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় । ধীরে ধীরে এই শোভাযাত্রা বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হয়ে গিয়েছে। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি পায় এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এটি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে নিজের পরিচিতি করে নিয়েছে। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল আনন্দ আয়োজনই না। বরং বাঙালি পরিচয়ে বিশ্বাসী মানুষের এক মিলন মেলাও। এই শোভাযাত্রা নতুন বছরের নতুন চেতনা ও আশার প্রতীক, এই শোভাযাত্রা শান্তির বার্তা, এই শোভাযাত্রা দীর্ঘদিনের বাঙালি ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। বাঙালির এই সংস্কৃতিগত পরিচয়কে কোনো বেড়াজালেই আবদ্ধ করা উচিত নয়। ধর্ম কিংবা রাজনীতির বাইরে রেখে বাঙালি সংস্কৃতিকে বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে, সামাজিক মানুষ হিসেবে আমাদের ধর্মীয় পরিচয়ও থাকবে। এইসব পরিচয় যেমন সত্য, তেমন সত্য আমাদের জাতিগত পরিচয়। এই পরিচয় আমরা পেয়ে এসেছি আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। সেই শেকড়কে ভুলে গেলে চলবে না। বরং বাঙালি তার শিকড়কে মনে রেখে শিখরে উঠতে পারলেই বাংলা সংস্কৃতি বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক

টাইমলাইন: পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

‘আমাকে কোনো জমি দেওয়া হয়নি’

‘আমাকে কোনো জমি দেওয়া হয়নি’

বাংলাদেশিদের জন্য এআই ও রোবোটিক চিকিৎসায় মনিপালের উদ্যোগ

বাংলাদেশিদের জন্য এআই ও রোবোটিক চিকিৎসায় মনিপালের উদ্যোগ

পাকার আগে হাওরে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন-জীবিকা

পাকার আগে হাওরে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন-জীবিকা

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App