×

বিশেষ সংখ্যা

নববর্ষ: বাঙালির সংস্কৃতি-সংকট ও আত্মপরিচয়ের লড়াই

Icon

অনামিকা রায়

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম

নববর্ষ: বাঙালির সংস্কৃতি-সংকট ও আত্মপরিচয়ের লড়াই

নববর্ষ: বাঙালির সংস্কৃতি-সংকট ও আত্মপরিচয়ের লড়াই

পহেলা বৈশাখ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি নতুন দিনের সূচনা নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক চেতনার এক গভীর প্রতীক। জীর্ণ পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুনের আহ্বান জানানো এই দিনটি গ্রামবাংলার মাঠঘাট থেকে শুরু করে নগর জীবনের ব্যস্ত কংক্রিটেও এক অনন্য প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এই উৎসব শুধুই আনন্দের নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার এক গভীর প্রতিফলন।

বাংলা নববর্ষ পালনের ইতিহাস বলে, মোগল সম্রাট আকবর কৃষি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে এই পঞ্জিকার প্রচলন করেন। এটি স্পষ্টত বার্তা দেয় বাংলা নববর্ষ পালন শুরু থেকেই ধর্মীয় নয়, বরং ছিল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে গড়ে ওঠা এক সময়চক্র। ধীরে ধীরে এটি কৃষিজীবী সমাজের জীবনের সঙ্গে মিশে যায়। এরপর হালখাতা, মেলা, নতুন হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে রূপ নেয় সামাজিক উৎসবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে বাঙালির জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসব। শহর থেকে গ্রাম, পাড়া থেকে মহল্লা সবখানেই এর রূপ ভিন্ন হলেও অনুভূতি এক। শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা, চারুকলার রঙিন আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান; আর গ্রামে হালখাতা, পান্তা ভাত, নানা রকম ভর্তা, নৌকা বাইচ, লাঠিখেলা- সব মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে এই দিনটিকে ঘিরে।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলা নবর্ষের আয়োজন শুধু আর আনন্দ উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পহেলা বৈশাখ একটি গুরুত্বপূর্ণ কালচারাল ইকোনমি তৈরি করেছে। পোশাক শিল্প, ফ্যাশন হাউস, অনলাইন মার্কেটিং, রেস্টুরেন্ট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, সব ক্ষেত্রেই বৈশাখ কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়। এটি একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে নিজস্ব সংস্কৃতিকেও ত্বরান্বিত করে। তবে এই বিশাল বাণিজ্যিকীকরণের মধ্যেও আমাদের সতর্ক থাকা দরকার। কারণ উৎসব যখন মূল সাংস্কৃতিক বার্তা হারিয়ে শুধুই বাজারজাত পণ্যে পরিণত হয়, তখন তার আত্মা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পান্তা-ইলিশ বা বৈশাখী পোশাক যখন কেবল ফ্যাশন আইটেম হয়ে দাঁড়ায়, তখন সভাবত প্রশ্ন ওঠে- আমরা কি আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতি পালন করছি, নাকি কেবল ভোক্তা আচরণে অংশ নিচ্ছি?

পহেলা বৈশাখ বাঙালির সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের প্রতীক। এটি আমাদের শেখায় পুরাতন ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে নতুন করে শুরু করতে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই সংস্কৃতি এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে শহুরে সংস্কৃতিতে বৈশাখ একটি স্টাইল স্টেটমেন্ট হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে এটি এখনো লোকজ ঐতিহ্যের ধারক। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি না হলে সংস্কৃতি ধীরে ধীরে শ্রেণিবিভক্ত হয়ে পড়বে।

দীর্ঘ বছর ধরে মঙ্গল শোভাযাত্রা এই উৎসবের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকগুলোর একটি। এটি শুধু রঙিন মুখোশ বা প্রতীক নয়, বরং এটি একধরনের শিল্পীসুলভ প্রতিবাদ, যেখানে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়গান উচ্চারিত হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি এই উৎসবকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। তবে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। এর নাম পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এই উৎসবের মৌলিক চরিত্রকে কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমাদের মনে রাখা দরকার, সংস্কৃতি যখন রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তার সর্বজনীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনীতি স্বভাবতই ক্ষমতা, মতাদর্শ ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে সংস্কৃতি হলো সংযোগ, সহাবস্থান এবং মানবিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। যখন রাজনৈতিক শক্তি সংস্কৃতিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন সংস্কৃতি তার স্বাতন্ত্র্য ও নিরপেক্ষ অবস্থান হারায়। কোনো উৎসব, প্রতীক বা ঐতিহ্য তখন আর সবার জন্য সমান অর্থ বহন করে না বরং তা একটি বিভাজনের সীমারেখা টেনে দেয়।

এই বিভাজনের ফলে প্রথমে যা ঘটে তা হলো, সংস্কৃতির অর্থ সংকুচিত হয়ে যায়। একটি উৎসব যা একসময় কৃষি, প্রকৃতি বা মানবিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেটি ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট মতাদর্শের পরিচায়ক হিসেবে উপস্থাপিত হতে শুরু করে। ফলে সমাজের একটি অংশ সেটিকে আপন মনে করে, আরেকটি অংশ সেটি থেকে দূরে সরে যায়। এতে সংস্কৃতির মূল শক্তি, সামাজিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে। আদর্শিক বিভাজন সংস্কৃতিকে প্রতীকী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে।

জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হলেও বাস্তবে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বারবার সামনে আসে বিতর্ক। বিগত কয়েক বছর ধরে পহেলা বৈশাখ নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক হলো এর ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা। কিছু গোষ্ঠী এটিকে ইসলামের বিধানের পরিপন্থী বা হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করে বিরোধিতা করে আসছে। তার মনে করে এটি ইসলামের বিশ্বাস ও জীবনধারার সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ ধরনের বিরোধিতার পেছনে একটি বড় কারণ হলো সংস্কৃতি ও ধর্মকে একই সমান্তরাল স্তরে না দেখে একে অপরের বিকল্প হিসেবে দেখার প্রবণতা। অথচ বাস্তবে সংস্কৃতি এবং ধর্ম সবসময় একই জিনিস নয়। ধর্ম মানুষের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও নৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করে, আর সংস্কৃতি মানুষের সামাজিক জীবন, আনন্দ, অভ্যাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে। একটি সমাজে একই সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বজায় রাখা সম্পূর্ণ সম্ভব। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধরনের ব্যাখ্যা অনেক সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও যুক্ত থাকে, ফলে একটি নিরীহ উৎসবও কখনো কখনো পরিচয়গত বিভাজনের প্রতীকে পরিণত হয়।

অথচ, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই উৎসবকে ধর্মীয় বিভাজনের বাইরে গিয়ে একটি সামাজিক মিলনমেলা হিসেবে পালন করে আসছে দীর্ঘকাল। ঐতিহাসিকভাবে এই উৎসব কোনো ধর্মীয় রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। বরং এটি কৃষি অর্থনীতি, হালখাতা এবং ঋতুচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই একে ধর্মীয় সংকীর্ণতার চোখে দেখা ইতিহাসের বিকৃতি ছাড়া কিছু নয়।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে পহেলা বৈশাখ সবসময়ই এক ধরনের সামাজিক সংহতির প্রতীক। তবে একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক প্রতিরোধেরও ভাষা। ১৯৮০-৯০ এর দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্ম হয়েছিল। এ কারণে এই উৎসব শুধু আনন্দ নয়, বরং গণতান্ত্রিক চেতনারও প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন, মতাদর্শগত বিভাজন এবং সামাজিক মেরুকরণ এই উৎসবের ওপর প্রভাব ফেলছে। ২০০১ সালের রমনা বটমূলে বোমা হামলা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক ভয়াবহ দাগ রেখে গেছে। এটি দেখিয়েছে যে সংস্কৃতি কেবল নিরাপদ বিনোদন নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্যবস্তুও হতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। এর পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। ইরান ও আশেপাশের অঞ্চলে যুদ্ধ বা সংঘাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর জ্বালানি দেশ হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শিল্প খাতে। এতে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো কঠিন করে তুলেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের রেমিট্যান্সও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যেকোনো যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক সংকট তাদের চাকরি ও আয়ে প্রভাব ফেলে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে বড় শঙ্কার কারণ।

এই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ সমাজ যত বেশি সংকটে পড়ে, তত বেশি তার সংস্কৃতির শেকড় তাকে ধরে রাখে। এই শেকড়ই মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস, মূল্যবোধ এবং সম্মিলিত অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে। অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বৈশ্বিক যুদ্ধের উত্তেজনার সময়েও সংস্কৃতি মানুষের মনে স্থিতি ও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে। সংস্কৃতি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও দেয়। একটি সমাজ যখন তার সাহিত্য, সংগীত, উৎসব, লোকজ ঐতিহ্য এবং ভাষার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তখন সে বাইরের চাপের মধ্যেও নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারে। এই সংযোগ মানুষকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল রেখে সামাজিকভাবে একত্রিত করে।

এই সত্যকে উপলদ্ধি করতে হবে যে, একটি জাতির সংস্কৃতিই তার নিজস্ব ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, ভাষা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার জাগরণ ঘটায়। যা যুক্তি ও মননশীলতার প্রসারে সমাজকে প্রাণবন্ত করে। এটি ঔপনিবেশিক বা বাহ্যিক প্রভাবের বিপরীতে স্বকীয়তাকে ধরে রেখে নতুন সৃজনশীলতার জন্ম দেয় এবং জাতিকে এগিয়ে নেয়। বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এই জাগরণ খুবই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

লেখক: সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

টাইমলাইন: পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বাঁধনের ওপর হামলাকারীদের দেশে ফেরাতে ‘সর্বোচ্চ’ চেষ্টা করবে সরকার

বাঁধনের ওপর হামলাকারীদের দেশে ফেরাতে ‘সর্বোচ্চ’ চেষ্টা করবে সরকার

নতুন পে-স্কেলে অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনে বড় স্বস্তি

নতুন পে-স্কেলে অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনে বড় স্বস্তি

পরীমণির বায়োপিকে অভিনয় করতে চান দীঘি, নেপথ্যে কী

পরীমণির বায়োপিকে অভিনয় করতে চান দীঘি, নেপথ্যে কী

হজ প্যাকেজে বড় ছাড়

হজ প্যাকেজে বড় ছাড়

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App