×

মুক্তচিন্তা

মক্কা প্রতিরক্ষা জোট ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরাভব: বাস্তবতা বনাম সামরিক কল্পনা

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০২ পিএম

মক্কা প্রতিরক্ষা জোট ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরাভব: বাস্তবতা বনাম সামরিক কল্পনা

ফাইল ছবি

ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রসায়ন অত্যন্ত নির্মম। এখানে আবেগের চাদর জড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কৌশল নির্ধারণের সুযোগ নেই; অলীক উম্মাহ-ভাবাবেগে ভেসে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ারও অবকাশ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে’ বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক মহলে যে উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অবস্থানে তা আপাতত বড় ধাক্কা খেয়েছে। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, এই মুহূর্তে 'মক্কা চুক্তি' সম্প্রসারণ বা নতুন সদস্য নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। ফলে ঢাকার প্রকাশ্য ইতিবাচক আগ্রহের বিপরীতে জোটের দরজা আপাতত বন্ধ। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

সমস্যার শুরু হয়েছিল জোটটির চরিত্র ও সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রভাবকে অতিরিক্ত সরলভাবে দেখার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে জোটটিকে মুসলিম বিশ্বের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা এবং মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। রাজনৈতিক মহলেও এটিকে সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা জোট সাধারণ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক জোটের মতো নয়। এর সঙ্গে সামরিক সক্ষমতা, পারস্পরিক নিরাপত্তা-স্বার্থ, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব কৌশলগত অগ্রাধিকার সরাসরি যুক্ত।

বিশেষ করে রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের মতো রাষ্ট্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোকে শুধু ‘মুসলিম বিশ্বের ঐক্য’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে এর বাস্তব কৌশলগত সমীকরণ আড়ালে পড়ে যায়। রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি আবেগের পরিচয় বহন করতে পারে, কিন্তু তার পরিণতি নির্ধারিত হয় স্বার্থ, সক্ষমতা ও ভূগোলের হিসাবেই।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভূগোলের বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্কযুক্ত কোনো সামরিক কাঠামোয় বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা স্বাভাবিকভাবেই নয়াদিল্লির নিরাপত্তা-উদ্বেগ বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের প্রতিক্রিয়াও সেই উদ্বেগের ইঙ্গিত দিয়েছে।

বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভারতের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চল শিলিগুড়ি করিডোর বা 'চিকেনস নেক'কে ঘিরে ভারত অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেখানে সামরিক ভারসাম্য নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়াও পড়তে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করা তাই কোনোভাবেই হালকা সিদ্ধান্ত হতে পারে না।

আরেকটি প্রশ্ন সামরিক সক্ষমতার। কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগদানের আগে বাংলাদেশের প্রথমে নির্ধারণ করা দরকার- জোটটি তার নিরাপত্তা-স্বার্থে ঠিক কী বাস্তব সুবিধা দেবে। একটি দেশের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ, যৌথ মহড়া কিংবা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আর একটি কার্যকর বহুপাক্ষিক প্রতিরক্ষা-জোটে প্রবেশ এক বিষয় নয়। জোটের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, সামরিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো এবং সদস্যদের পারস্পরিক স্বার্থ- সবকিছুর হিসাব করতে হয়।

আরও পড়ুন: সাইবার নিরাপত্তা-আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার

এখানেই পাকিস্তানকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রত্যাশার প্রশ্ন আসে। পাকিস্তান বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় অংশীদার হতে পারে; প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত যোগাযোগও দুই দেশের স্বার্থে হতে পারে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে ধরে নেওয়া ভুল। ইসলামাবাদের নিজস্ব নিরাপত্তা অগ্রাধিকার, ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক কৌশল- সবকিছুর ওপরই তার সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে। তাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা কোনো বহিরাগত রাষ্ট্রের সদিচ্ছার ওপর নয়, নিজের সক্ষমতা ও বহুমাত্রিক কূটনীতির ওপর দাঁড়ানোই অধিক বাস্তবসম্মত।

তাহলে মক্কা প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়ে ঢাকার আগ্রহের পেছনে কী প্রত্যাশা কাজ করেছিল? এখানে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিপুল মানবসম্পদ, সামরিক প্রশিক্ষণ ও শান্তিরক্ষা অভিজ্ঞতার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথাও বিবেচনায় আসতে পারে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বড় অবদান রেখে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতারও নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য রয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কোনো বহুপাক্ষিক সামরিক জোটে প্রবেশের একমাত্র যুক্তি বানানো উচিত নয়।

কারণ অর্থনৈতিক লাভের হিসাব আর জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব এক নয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার বিনিময়ে কোনো বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে পড়া হলে লাভের চেয়ে ঝুঁকি বড় হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি হওয়া উচিত এই ভারসাম্যটি বোঝা।

সৌভাগ্যক্রমে, সামরিক জোটের বাইরেও বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর কিছু উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যে আমদানিনির্ভরতার সীমাবদ্ধতা এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তার কথা এসেছে। চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, চীনের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং ড্রোন প্রযুক্তিতে সক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টা- এসবকে বহুপাক্ষিক সামরিক জোটের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার অংশ হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

আরও পড়ুন: ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বেলায়েত হোসেনের পদত্যাগ

কারণ সত্যিকারের কৌশলগত স্বাধীনতা আসে অন্যের সামরিক ছাতার নিচে দাঁড়ানো থেকে নয়; আসে নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। অস্ত্র আমদানি করা যেতে পারে, প্রযুক্তি নেওয়া যেতে পারে, প্রশিক্ষণ ও যৌথ উৎপাদন করা যেতে পারে- কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা নিজের হাতে রাখাই সার্বভৌম প্রতিরক্ষা নীতির ভিত্তি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের নীতিবাক্য- 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়' -এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। এর অর্থ কারও সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা না করা নয়; বরং কোনো একক শক্তি বা জোটের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে নিজের রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে গুলিয়ে না ফেলা।

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের দরজা আপাতত বন্ধ হয়ে যাওয়াকে তাই শুধু একটি জোটে বাংলাদেশের প্রবেশের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির জন্য একটি আয়না। সেই আয়নায় দেখা যাচ্ছে- আবেগ দিয়ে ভূ-রাজনীতি বোঝা যায় না, আর সামরিক কল্পনা দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।

এখন প্রয়োজন মুখ রক্ষা করার কূটনৈতিক ব্যাখ্যা নয়, কৌশলগত আত্মসম্মান রক্ষা করা। বাংলাদেশের উচিত অলীক 'উম্মাহ' সামরিক কল্পনায় বিভোর না হয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং প্রতিটি আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে জাতীয় স্বার্থের কঠিন মাপকাঠিতে বিচার করা।

ভূ-রাজনীতির মঞ্চে অন্যের কৌশলের অংশীদার হওয়ার চেয়ে নিজের কৌশল নির্ধারণ করার সক্ষমতাই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কোনো জোটের দরজা খোলার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়; বরং এমন সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করা উচিত, যাতে কোনো দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের নিরাপত্তার জন্য অপেক্ষা করতে না হয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মক্কা প্রতিরক্ষা জোট ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরাভব: বাস্তবতা বনাম সামরিক কল্পনা

মক্কা প্রতিরক্ষা জোট ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরাভব: বাস্তবতা বনাম সামরিক কল্পনা

৩০ বছরেও থামেনি মানুষ-হাতির রক্তক্ষয়ী সংঘাত

প্রাণ গেছে ৩৪ জনের ৩০ বছরেও থামেনি মানুষ-হাতির রক্তক্ষয়ী সংঘাত

আগামী শুক্র ও শনিবার ব্যাংক খোলা রাখার অনুরোধের কী কারণ

আগামী শুক্র ও শনিবার ব্যাংক খোলা রাখার অনুরোধের কী কারণ

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বেলায়েত হোসেনের পদত্যাগ

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বেলায়েত হোসেনের পদত্যাগ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App