×

মুক্তচিন্তা

বালু লুটের মহোৎসব: রাষ্ট্রের জবাবদিহি কোথায়?

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৯ পিএম

বালু লুটের মহোৎসব: রাষ্ট্রের জবাবদিহি কোথায়?

ফাইল ছবি

নদী থেকে বালু তোলা হয়, তারপর ভাঙে নদীর পাড়; পাড়ের সঙ্গে ভাঙে মানুষের ঘর, ফসলের জমি, সড়ক, স্কুল-মসজিদ-মাদ্রাসা। কোথাও স্থানীয়রা প্রতিবাদ করেন, কোথাওবা লিখিত অভিযোগ দেন, কোথাও প্রশাসন অভিযান চালায়, জরিমানা করে, নৌকা বা ড্রেজার আটক করে। কিন্তু কিছুদিন পর আবার রাতের অন্ধকারে নদীতে নামে ড্রেজার। এই চক্র যেন কিছুতেই থামতে চায় না। সুনামগঞ্জের কয়েকটি নদী ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই কেবল অবৈধ বালু উত্তোলনের বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়; এগুলো নদী ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক নজরদারি, আইনের প্রয়োগ এবং জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের জবাবদিহির বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে।

দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা নদীর ঘটনাটি এর সাম্প্রতিক ও দৃশ্যমান উদাহরণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীটির তলদেশের পাশাপাশি তীর কেটে শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এতে সারপিনপাড়া, পূর্ব চাইরগাঁও, পূর্ব সোনাপুর, লোভিয়া, হাবিবনগর, নাছিমপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। পূর্ব সোনাপুর জামে মসজিদ ও হোসাইনিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসাও ঝুঁকিতে রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

অভিযোগের তীব্রতা বোঝাতে ২৭ সেপ্টেম্বর রাতের ঘটনাটিই যথেষ্ট। বালু উত্তোলনের জন্য মরাচেলা নদীতে আসা একটি নৌকায় স্থানীয় লোকজন আগুন ধরিয়ে দেন। জনতার এ ধরনের প্রতিক্রিয়া কোনোভাবেই আইনসম্মত সমাধান নয়; আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্যও নয়। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন থাকে- এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন?

স্থানীয়দের দাবি, তাঁরা দুই বছর ধরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ করে আসছেন এবং প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। দোয়ারাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম তালুকদার জানিয়েছেন, মরাচেলা নদী ইজারাবিহীন এবং অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চলছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহও নদীর পাড় কাটার প্রবণতা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার রাতে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নেতৃত্বে অভিযানে প্রায় ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্নটি খুব সরল: অভিযান হচ্ছে, জরিমানা হচ্ছে- তবু নদীতে ড্রেজার ফিরছে কীভাবে?

সোনালী চেলা নদীর ঘটনাতেও একই প্রশ্ন সামনে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান ও প্রতিবাদের পরও রাতের আঁধারে বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার চালিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত নদীর কয়েকটি এলাকায় ড্রেজারের কার্যক্রম দেখা গেছে বলেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে কোন ড্রেজার বৈধ, কোনটি ইজারাকৃত এলাকার মধ্যে এবং কোনটি ইজারার বাইরে- এসব তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এখানেই মূল প্রশ্ন। অবৈধ উত্তোলন ঠেকাতে শুধু ড্রেজার দেখা যথেষ্ট নয়; ইজারার সীমানা, অনুমোদিত উত্তোলন এলাকা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং বালুর উৎস- সবকিছুর স্বচ্ছ যাচাই দরকার।

সোনালী চেলায় আরও একটি উদ্বেগজনক বিষয় সামনে এসেছে। নদী রক্ষার দাবিতে প্রতিবাদ করা কয়েকজনের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলা হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে সাক্ষীর মাধ্যমে মামলা করা হয়েছে এবং তদন্তে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে আইনের মৌলিক নীতিটি স্পষ্ট থাকা জরুরি- অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হবে, কিন্তু অপরাধ নির্ধারিত হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। 

প্রতিবাদকারী হলেই কেউ অপরাধী নন; আবার প্রতিবাদকারী হলেই কেউ আইনের ঊর্ধ্বেও নন।

তাহিরপুরের শান্তিপুর নদীর ঘটনাটি প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্নটিকে আরও তীব্র করে। ১১ সেপ্টেম্বর ইজারাবিহীনভাবে উত্তোলনের অভিযোগ থাকা বালু তিনটি নৌকায় করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনেই এনে রাখা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশাসন বালু জব্দের নির্দেশ দেয়। 

আরও পড়ুন: দিল্লিতে বিমসটেকের বৈঠকে যাচ্ছেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ঘটনাটি শুধু বিস্ময়কর নয়, ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক দুর্বলতাও সামনে আনে। নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ঠেকানোর দায়িত্ব যাদের, তাঁদের কার্যালয়ের সামনে যদি সেই বালুর স্তূপ এসে পৌঁছায়, তাহলে শুধু বালুর মালিক কে- এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো, নদী থেকে তীরে, তীর থেকে পরিবহন এবং পরিবহন থেকে মজুত- পুরো প্রক্রিয়াটি নজরদারির বাইরে থাকে কীভাবে?

যাদুকাটা নদীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সংকটটির আরেকটি দিক সামনে এনেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে একটি কয়লাবাহী বাল্কহেড আটকে 'খাস কালেকশন' বাবদ ৯০ হাজার টাকা দাবি এবং টাকা না দেওয়ায় রাতভর আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। নৌযানের সুকানির দাবি, নির্ধারিত খাতে আগেই টাকা পরিশোধ করে রশিদ নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগটির সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। তবে 'খাস কালেকশন' যদি বৈধ সরকারি রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে এর হার, আদায়ের স্থান, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং অর্থ জমার প্রক্রিয়া অবশ্যই প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য হওয়া উচিত।

একই সঙ্গে যাদুকাটা নদীর বালুমহাল নিয়ে বৈজ্ঞানিক জরিপের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। বালুর প্রকৃত পরিমাণ, অবস্থান এবং কোন স্থান থেকে কতটা উত্তোলন করা সম্ভব- এসব নির্ধারণে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন তথ্য, পরিমাপ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন।

এই বাস্তবতায় সমাধান শুধু আরও কয়েকটি অভিযান নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক নদী-শাসন ব্যবস্থা। কোথায় ইজারা দেওয়া হয়েছে, তার সীমানা মাঠপর্যায়ে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকতে হবে। কোথায় বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ, কোথায় নির্দিষ্ট শর্তে অনুমোদিত- সেটিও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। পরিবেশবান্ধব উত্তোলন পদ্ধতি ও স্থান, পরিমাণ এবং বালুর গন্তব্য নিয়মিত যাচাই করতে হবে। নদীর তীর কাটার অভিযোগ উঠলে দ্রুত কারিগরি পরিদর্শন করতে হবে। আর সরকারি রাজস্ব আদায়ের নামে অর্থ নেওয়া হলে তার প্রতিটি ধাপ হতে হবে স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অভিযান যেন কেবল নৌকার শ্রমিক বা চালকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে তাঁর পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান বা প্রভাব বিবেচনায় না এনে আইন প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করাও চলবে না। অভিযোগের তদন্ত এবং অপরাধের প্রমাণ- দুটিকে আলাদা রাখাই আইনের শাসনের মৌলিক শর্ত।

নদীকে বাঁচানো মানে তো শুধু নদীর পানি বা বালু রক্ষা করা নয়; নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের ঘর, জমি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। আজ যে বালুর স্তূপকে নিছক একটি পণ্য মনে হচ্ছে, কাল সেটিই হয়তো কোনো পরিবারের ভাঙা ঘরের স্মৃতি হয়ে দাঁড়াবে। আজ যে ড্রেজারের শব্দে কোনো কোনো ব্যবসা চলছে, কাল সেই উত্তোলনের মূল্য দিতে হতে পারে একটি পুরো জনপদকে।

সুতরাং প্রশ্নটি শুধু- বালু উত্তোলন বন্ধ হবে কবে?-এটি নয়। প্রশ্নটি আরও বড়: নদী রক্ষায় রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কবে?

নদী কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। বালুও সীমাহীন প্রাকৃতিক সম্পদ নয়। নদী থেকে সম্পদ আহরণ যদি আইনসম্মত হয়, তা হতে হবে স্বচ্ছতা ও পরিবেশগত শর্ত মেনে; আর যদি অবৈধ হয়, তা বন্ধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ একটি নদী হারালে শুধু একটি জলধারা হারায় না- হারায় একটি জনপদের নিরাপত্তা, কৃষির ভিত্তি, মানুষের জীবিকা এবং ভবিষ্যতের একটি অংশ।

নদী রক্ষার লড়াইও শুধুমাত্র ড্রেজার বন্ধ করার লড়াই নয়। এটি বালু উত্তোলন এবং সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার লড়াই; এটি প্রশাসনিক নজরদারি ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার লড়াই; সর্বোপরি, এটি জনস্বার্থে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার লড়াই।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বালু লুটের মহোৎসব: রাষ্ট্রের জবাবদিহি কোথায়?

বালু লুটের মহোৎসব: রাষ্ট্রের জবাবদিহি কোথায়?

দিল্লিতে বিমসটেকের বৈঠকে যাচ্ছেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দিল্লিতে বিমসটেকের বৈঠকে যাচ্ছেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রিয়াদ বিমানবন্দরে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তীব্র আতঙ্ক

রিয়াদ বিমানবন্দরে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তীব্র আতঙ্ক

ডার্টি পিকচার-২ এ এবারও কি বিদ্যা মুখ্য চরিত্রে?

ডার্টি পিকচার-২ এ এবারও কি বিদ্যা মুখ্য চরিত্রে?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App