পেঁয়াজের প্রক্রিয়াজাতকরণ
ড. শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
১০ মে ২০২৬ তারিখে একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বেদনাদায়ক খবর- ‘পচে যাচ্ছে পেঁয়াজ, কৃষকের কান্না’। ছবিতে দেখা গেছে, মাঠের পাশে স্তূপ করে রাখা পেঁয়াজ ধীরে ধীরে পচে যাচ্ছে। যে পেঁয়াজ ফলাতে একজন কৃষক মাসের পর মাস পরিশ্রম করেছেন, সেই পেঁয়াজ আজ বিক্রি করার মতো দাম পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও কৃষক বাজারে নেয়ার চেয়ে ক্ষেতেই ফেলে রাখা ভালো মনে করছেন। বাংলাদেশে এই দৃশ্য নতুন নয়। প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো ফসল নিয়ে একই ঘটনা ঘটে। কখনো পেঁয়াজ, কখনো আলু, কখনো টমেটো, কখনো কাঁচামরিচ। যখন ফলন কম হয়, তখন বাজারে দাম বাড়ে, সাধারণ মানুষ কষ্ট পায়। আবার যখন ফলন বেশি হয়, তখন কৃষক কষ্ট পায়। অর্থাৎ লাভের সময় কৃষক লাভ পান না, ক্ষতির সময়ও ক্ষতির বোঝা তার কাঁধেই পড়ে।
এর প্রধান কারণ হলো- আমরা এখনও বেশির ভাগ কৃষিপণ্য কাঁচা অবস্থায় বিক্রি করি। ফসল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের আধুনিক চিন্তা এখনো গ্রামের পর্যায়ে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। ফলে কৃষক উৎপাদক হয়েও প্রকৃত ব্যবসায়ী হতে পারেন না। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশ আজ কৃষিকে শুধু চাষ হিসেবে দেখে না, তারা কৃষিকে শিল্প হিসেবে দেখে। কৃষক শুধু চাষি নন, তিনি উদ্যোক্তা। বাংলাদেশেও সেই পরিবর্তনের সময় এসেছে।
আজ যে পেঁয়াজ কেজিতে ৮ বা ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, কয়েক মাস পরে সেই একই পেঁয়াজ ৮০ বা ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। মাঝখানের লাভ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী, গুদাম মালিক, ব্যবসায়ী ও প্রক্রিয়াজাতকারীদের হাতে। অথচ কৃষক যদি নিজেই সামান্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারেন, তাহলে তিনিও সেই লাভের অংশীদার হতে পারেন। এক কেজি কাঁচা পেঁয়াজের দাম হয়তো ১০ টাকা। কিন্তু সেই পেঁয়াজ যদি শুকিয়ে ঙহরড়হ ঋষধশবং বানানো হয়, তাহলে তার মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আবার সেই পেঁয়াজ যদি তেলে ভেজে ঋৎরবফ ঙহরড়হ বানানো হয়, তাহলে সেটি আরো বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব। অর্থাৎ একই পণ্য, কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে তার মূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। এটিকেই বলে মূল্য সংযোজন। বাংলাদেশের কৃষক যদি এই মূল্য সংযোজন শিখতে পারেন, তাহলে তারা আর শুধু কাঁচামালের বিক্রেতা থাকবেন না, তারা হয়ে উঠবেন উদ্যোক্তা।
খাদ্য নিয়ে কাজ করার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি। আমরা যেমন খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুই, তেমনি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করার আগেও হাত পরিষ্কার রাখা বাধ্যতামূলক। অনেক সময় গ্রামের পরিবেশে আমরা খাদ্যকে খুব সাধারণভাবে দেখি। কিন্তু বাজারে বিক্রি করার জন্য খাদ্য তৈরি করতে হলে সেটিকে নিরাপদ রাখতে হবে। কারণ একজন ক্রেতা যখন শুকনা পেঁয়াজ বা ভাজা পেঁয়াজ কিনবেন, তখন তিনি আশা করবেন সেটি পরিষ্কার, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ।
পেঁয়াজ ধরার আগে হাত সাবান দিয়ে ধুতে হবে। নখ পরিষ্কার রাখতে হবে। নোংরা কাপড় দিয়ে পেঁয়াজ মোছা যাবে না। যেসব পাত্রে পেঁয়াজ রাখা হবে, সেগুলো পরিষ্কার হতে হবে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করার জায়গাটিও পরিষ্কার রাখতে হবে। আশপাশে ময়লা, পশুপাখির মল, ধুলাবালি বা নোংরা পানি থাকা যাবে না। কারণ সামান্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশও পুরো পণ্যের মান নষ্ট করে দিতে পারে। আজকের পৃথিবীতে মানুষ শুধু খাবার কেনে না, তারা নিরাপদ খাবার কেনে। তাই পরিচ্ছন্নতা মানেই ব্যবসার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করা।
পেঁয়াজ প্রক্রিয়াজাত করার প্রথম ধাপ হলো ভালো ও খারাপ পেঁয়াজ আলাদা করা। অনেক সময় কৃষক সব পেঁয়াজ একসঙ্গে রাখেন। এতে একটি পচা পেঁয়াজ থেকেও অনেক ভালো পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। পচা, নরম, আঘাতপ্রাপ্ত বা রোগাক্রান্ত পেঁয়াজ দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। কারণ এসব পেঁয়াজে ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা অন্য পেঁয়াজেও ছড়িয়ে পড়ে। খোসাসহ পেঁয়াজ এবং খোসা ছাড়ানো পেঁয়াজও আলাদা রাখতে হবে। খোসার সঙ্গে মাটি ও জীবাণু থাকতে পারে। তাই খোসা ছাড়ানোর পরে পরিষ্কার পাত্রে আলাদা করে রাখতে হবে। এই ছোট ছোট নিয়মগুলোই আসলে একটি পণ্যের মান ঠিক করে দেয়।
বাংলাদেশে সূর্যের আলো একটি বড় সম্পদ। এই রোদ ব্যবহার করেই গ্রামের মানুষ সহজভাবে পেঁয়াজ শুকাতে পারেন। তবে সরাসরি মাটিতে পেঁয়াজ শুকানো ঠিক নয়। কারণ মাটির ধুলা, জীবাণু ও আর্দ্রতা পণ্যের ক্ষতি করতে পারে। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো পরিষ্কার চকি, বাঁশের মাচা বা উঁচু প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা। সেখানে পরিষ্কার কাপড় বিছিয়ে পেঁয়াজ শুকাতে হবে। উঠানের উঁচু স্থানে রাখলে ধুলাবালি কম লাগে এবং বাতাস চলাচল ভালো হয়।
পেঁয়াজ শুকানোর সময় মাছি, পোকামাকড় ও ধুলাবালি থেকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য উপরে পাতলা পলিথিন, নেট বা মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে সূর্যের আলো ঢুকবে, কিন্তু ময়লা ঢুকবে না। রাতে অবশ্যই পেঁয়াজ ঘরের ভেতরে নিয়ে রাখতে হবে। কারণ শিশির পড়লে আবার আর্দ্রতা ফিরে আসে এবং শুকনা পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
অনেক কৃষক মনে করেন পেঁয়াজ শুকালে বা ভাজলে হয়তো খুব কম পণ্য পাওয়া যায়। বাস্তবে পেঁয়াজের বেশির ভাগ অংশই পানি। সাধারণত কাঁচা পেঁয়াজের মধ্যে প্রায় ৮৫% থেকে ৯০% পর্যন্ত আর্দ্রতা থাকে। অর্থাৎ ১ কেজি কাঁচা পেঁয়াজের মধ্যে মাত্র ১০% থেকে ১৫% অংশ শুকনা উপাদান থাকে। ১ কেজি কাঁচা পেঁয়াজ থেকে সাধারণত প্রায় ৯০ গ্রাম থেকে ১২০ গ্রাম পর্যন্ত শুকনা পেঁয়াজ পাওয়া যায়। কারণ শুকানোর সময় পেঁয়াজের ভেতরের পানি বের হয়ে যায় এবং শুধু শুকনা অংশটি থাকে। অর্থাৎ ১০ কেজি কাঁচা পেঁয়াজ থেকে প্রায় ১ কেজির মতো শুকনা পেঁয়াজ তৈরি হতে পারে।
ভাজা পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ফলন কিছুটা বেশি হয়, কারণ এতে তেল শোষিত হয়। সাধারণত ১ কেজি কাঁচা পেঁয়াজ থেকে প্রায় ১৮০ গ্রাম থেকে ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত ভাজা পেঁয়াজ পাওয়া যেতে পারে। ভাজার জন্য প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার তেল লাগতে পারে। ভাজার পরে পেঁয়াজে সাধারণত ২% থেকে ১০% আর্দ্রতা থাকে এবং চূড়ান্ত ভাজা পেঁয়াজের ওজনের প্রায় ১০% থেকে ২৫% পর্যন্ত অংশ তেল শোষণের কারণে আসে। এই কারণেই ভাজা পেঁয়াজের ওজন শুকনা পেঁয়াজের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে।
ওজন কমে গেলেও পণ্যের মূল্য কমে না, বরং অনেক বেড়ে যায়। কারণ শুকনা ও ভাজা পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়, পরিবহন সহজ হয় এবং অফ-সিজনে বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব। বর্তমানে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, নুডলস কোম্পানি, মসলা কোম্পানি ও ফাস্টফুড শিল্পে শুকনা ও ভাজা পেঁয়াজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ এখনো বিপুল পরিমাণ শুকনা পেঁয়াজ বিদেশ থেকে আমদানি করে। অথচ দেশের কৃষকরাই এটি তৈরি করতে পারেন।
গ্রামের মানুষ খুব সহজেই এই পণ্য তৈরি করতে পারেন। পেঁয়াজ কুচি করে তেলে ভেজে শুকনো অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়। এরপর ছোট প্লাস্টিক কনটেইনার বা প্যাকেটে ভরে বাজারে বিক্রি করা যায়। আজ যে পেঁয়াজ ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেটিই প্রক্রিয়াজাত করে ১০০ টাকার পণ্য বানানো সম্ভব। অর্থাৎ লাভের নতুন দরজা খুলে যেতে পারে।
শুধু পণ্য তৈরি করলেই হবে না, সেটিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করাও জরুরি। কারণ মানুষ প্রথমে পণ্যের প্যাকেট দেখে আকৃষ্ট হয়। ছোট পলিপ্যাক বা প্লাস্টিক কনটেইনারে ভরে লেবেল লাগানো যেতে পারে। সেখানে পণ্যের নাম, গ্রামের নাম, উৎপাদনের তারিখ ও মোবাইল নম্বর লেখা থাকতে পারে। একটি গ্রামের নাম দিয়েও ব্র্যান্ড তৈরি করা সম্ভব। এতে শুধু পণ্যের মূল্য বাড়বে না, গ্রামের পরিচিতিও তৈরি হবে।
বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউব ও অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করে গ্রামের মানুষও ব্যবসা করছেন। একজন কৃষক যদি নিজের শুকনা পেঁয়াজ বা ভাজা পেঁয়াজের ছবি ও ভিডিও অনলাইনে দেন, তাহলে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার পেতে পারেন। এখন মানুষ গ্রামের বিশুদ্ধ ও ঘরোয়া খাবারের প্রতি আগ্রহী। তাই অনলাইন বাজার কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পেঁয়াজ প্রক্রিয়াজাত করার কাজগুলো ঘরে বসেই করা সম্ভব। গ্রামের নারীরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এই কাজ করতে পারেন। এতে নারীদের আয় বাড়বে এবং পরিবারের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে গ্রামের বেকার যুবকদের জন্যও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কেউ শুকাবে, কেউ কাটবে, কেউ প্যাকেট করবে, কেউ অনলাইনে বিক্রি করবে। এভাবে একটি ছোট গ্রাম থেকেই ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠতে পারে।
যদি সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রশিক্ষণ দেয়, ছোট মেশিন সরবরাহ করে, সহজ ঋণের ব্যবস্থা করে এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা করে, তাহলে হাজার হাজার কৃষক লাভবান হতে পারেন। বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগগুলো গ্রামের কৃষকদের হাতে সহজ প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে পারে।
আজকের কৃষককে শুধু চাষ জানলেই হবে না। তাকে বাজার বুঝতে হবে, সংরক্ষণ জানতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, প্যাকেটিং জানতে হবে এবং মূল্য সংযোজন শিখতে হবে। যে কৃষক পেঁয়াজ শুকাতে জানেন, পরিচ্ছন্নভাবে খাদ্য তৈরি করতে পারেন, সুন্দর প্যাকেটে বাজারে বিক্রি করতে পারেন- তিনি আর ক্ষতির কৃষক নন, তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা।
বাংলাদেশের কৃষক যদি উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিখে ফেলেন, তাহলে আর পেঁয়াজ পচবে না, কৃষকও কাঁদবেন না। কৃষকের ঘর থেকেই শুরু হতে পারে বাংলাদেশের নতুন গ্রামীণ শিল্প বিপ্লব।
ড. শহীদুল ইসলাম : খাদ্যবিজ্ঞানী, যুক্তরাজ্য
