আল মাহমুদ
স্বরণীয়-বরণীয়
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আল মাহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬ - ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও সাংবাদিক। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিক, চেতনা ও বাক্ভঙ্গিতে সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রবাসী সরকারের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর তিনি সরকারবিরোধী সংবাদপত্র ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ (১৯৭২-১৯৭৪) পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং এ কারণে এক বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন।
পিতৃপ্রদত্ত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ হলেও তিনি আল মাহমুদ নামেই পরিচিতি পান। ১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামে জন্ম নেয়া এই কবি মূলত মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য পাঠে উদ্বুদ্ধ হয়ে লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা এসে সাংবাদিকতায় যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর নেন।
তার সাহিত্যের মূল উপজীব্য ছিল সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নর-নারীর চিরন্তন প্রেম ও বিরহ। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে আঞ্চলিক শব্দের স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত ‘লোক লোকান্তর’ কাব্যগ্রন্থ তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর ‘কালের কলস’ (১৯৬৬) এবং তার সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম ‘সোনালী কাবিন’ (১৯৭৩) তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এছাড়া তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ (১৯৭৫) এবং প্রথম উপন্যাস ‘কবির কোলাহল’ (১৯৯৩) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিশোরদের জন্য তার রচিত ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় সৃষ্টি।
১৯৭০-এর দশকের শেষার্ধে তার কবিতায় বিশ্বস্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ও ইসলামি চেতনার প্রতিফলন ঘটতে থাকলে তিনি প্রগতিশীলদের সমালোচনার মুখোমুখি হন। তবে সমালোচকদের মতে, দর্শন দিয়ে কবিতা নিয়ন্ত্রিত হয় না, কবিতা মূলত আবেগের কারবার। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৈয়দা নাদিরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাদের আটটি সন্তান রয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮৬ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া তিনি জয় বাংলা পুরস্কার, জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০২৫ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হন। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৮২ বছর বয়সে ঢাকায় এই কবি মৃত্যুবরণ করেন।
