×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

বর্ষায় হাওর বাঁচাতে বৃক্ষশক্তি

Icon

আমানুর রহমান

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষায় হাওর বাঁচাতে বৃক্ষশক্তি

বর্ষার হাওর অদ্ভুত সৌন্দর্যের আধার হলেও এর ভয়াল রূপ সেখানকার মানুষের জন্য এক নিয়মিত আতঙ্ক। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বিস্তীর্ণ এই হাওরাঞ্চল প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৪ শতাংশ। মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বর্ষার পানিতে পুরো এলাকাটি এক বিশাল সাগরে পরিণত হয়। এ সময় চারপাশের থইথই পানির মাঝে ছোট ছোট গ্রামগুলোকে একেকটি ভাসমান দ্বীপ বলে মনে হয়। তবে পানির তীব্র তোড় আর ঢেউয়ের আঘাতে এসব দ্বীপ প্রতিনিয়ত অস্তিত্ব-সংকটে ভোগে। বছরের পর বছর ধরে কোটি টাকার বাঁধ নির্মাণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা টেকসই হয় না। প্রকৃতির এই প্রবল শক্তির সামনে মানুষের তৈরি কৃত্রিম প্রতিরোধব্যবস্থা যখন বারবার হার মানে, তখন হাওরকে বাঁচাতে সবচেয়ে কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয় প্রকৃতিরই এক অসামান্য দান- বৃক্ষশক্তি।

হাওরের বর্ষাকালীন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘আফাল’, যা মূলত প্রবল বাতাসে সৃষ্ট বিশাল ও ধ্বংসাত্মক ঢেউ। বর্ষায় উন্মুক্ত হাওরে বাতাসের বেগ যখন ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটারে পৌঁছায়, তখন চার-পাঁচ ফুট উঁচু দানবীয় ঢেউ আছড়ে পড়ে গ্রামগুলোর ওপর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই আফালের কারণে প্রতি বছর হাওরাঞ্চলের শত শত গ্রাম ভাঙনের মুখে পড়ে এবং হাজার হাজার একর ফসলি জমি ও বসতভিটা জলে বিলীন হয়। ঢেউয়ের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য হাওরবাসী বাঁশ, বস্তা বা ইট-পাথরের দেয়াল তৈরি করলেও পানির প্রবল শক্তির কাছে তা সহজেই হার মানে। ক্রমাগত ভূমিক্ষয় ও বাস্তুচ্যুতি কেবল হাওরবাসীর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডই ভেঙে দিচ্ছে না, বরং সেখানকার জীবনযাত্রাকে করে তুলেছে চরম অনিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বাঁধের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিকভাবে অভিযোজিত একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রাচীর গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

আফালের এই ধ্বংসলীলা রুখতে হিজল, করচ ও বরুণের মতো জলাবনের বৃক্ষগুলো অদ্বিতীয় বর্ম হিসেবে কাজ করে। এই বিশেষ প্রজাতির গাছগুলো বছরের প্রায় ছয় মাস পানির নিচে তলিয়ে থাকলেও অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ করচ বা হিজল গাছ তার জালের মতো বিস্তৃত শিকড় দিয়ে প্রায় দশ মিটার ব্যাসার্ধের মাটিকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে রাখে। আফালের বিশাল ঢেউ যখন এই গাছগুলোর ওপর আছড়ে পড়ে, তখন এদের ডালপালা ও কাণ্ড প্রাকৃতিক ‘ব্রেকওয়াটার’ বা ঢেউ-নিরোধক হিসেবে কাজ করে ঢেউয়ের শক্তিকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ফলে ঢেউ যখন লোকালয়ে বা মাটির বাঁধে আঘাত করে, তখন তার আর ভাঙন ধরানোর মতো ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা থাকে না। প্রকৃতির এই রক্ষাকবচগুলো কেবল মাটিই ধরে রাখে না, বরং মাটির বাঁধের স্থায়িত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে হাওরের গ্রামগুলোকে নিরাপদে আগলে রাখে।

বৃক্ষরাজি কেবল হাওরের গ্রামগুলোকেই রক্ষা করে না, বরং এগুলো পুরো হাওরের বাস্তুতন্ত্রের প্রাণভোমরা হিসেবেও কাজ করে। হিজল-করচের বন হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অসামান্য ভূমিকা পালন করে। বর্ষায় যখন চারদিক পানিতে তলিয়ে যায়, তখন এসব গাছের পাতা ও ডালপালা স্থানীয় মাছের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও প্রজননক্ষেত্র হয়ে ওঠে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃক্ষসমৃদ্ধ হাওর এলাকায় মাছের উৎপাদন সাধারণ এলাকার চেয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি হয়। কারণ, গাছের পচা পাতা থেকে পানিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইটোপ্লাঙ্কটন বা মাছের প্রাকৃতিক খাবার তৈরি হয়। এছাড়া হাওরের এই বনভূমি প্রায় ২৫০ প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস। একদিকে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, অন্যদিকে জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের জোগান দিয়ে এই বৃক্ষগুলো হাওরবাসীর অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখতে নীরব কিন্তু জোরালো অবদান রাখছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে হাওরের এই প্রাকৃতিক বর্ম আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ৫০ বছরে হাওরাঞ্চল তার আদি জলাবনের প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি হারিয়েছে, যার খেসারত হিসেবে প্রতি বছর ভয়াবহ বন্যা ও ভাঙনের শিকার হতে হচ্ছে। হাওরকে বাঁচাতে হলে এখনই হাওরের চারপাশে, সড়কের দুই পাশে এবং দ্বীপসদৃশ গ্রামগুলোর সীমানায় পরিকল্পিতভাবে হিজল ও করচের বিশাল ‘সবুজ বেষ্টনী’ গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। হাওরের এই অপরূপ প্রকৃতি ও মানুষের জীবনধারাকে টিকিয়ে রাখতে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। বৃক্ষশক্তিকে কাজে লাগিয়েই আমরা হাওরকে এক স্থায়ী, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারি।

আমানুর রহমান : হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

হেলথ প্রশ্নে স্ত্রীকে দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দারুণ রসিকতা

হেলথ প্রশ্নে স্ত্রীকে দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দারুণ রসিকতা

উন্নয়ন-পরিবেশ-মানবকল্যাণ চলবে একই পথে

পরিবেশমন্ত্রী উন্নয়ন-পরিবেশ-মানবকল্যাণ চলবে একই পথে

আর্জেন্টাইন সেই শিশুর বক্তব্য ভাইরাল, গভীরভাবে নাড়া দিলো স্কালোনিকে

আর্জেন্টাইন সেই শিশুর বক্তব্য ভাইরাল, গভীরভাবে নাড়া দিলো স্কালোনিকে

শাহজালালের মাজারে দ্বিতীয়বারের মতো খোলা হলো দানবাক্স, চলছে গণনা

শাহজালালের মাজারে দ্বিতীয়বারের মতো খোলা হলো দানবাক্স, চলছে গণনা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App