বিপর্যয়ের মুখে হামাসের ক্ষমতা বিসর্জন কৌশল নাকি বাধ্যবাধকতা?
ড. এন এইচ এম আবু বকর
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে গাজা উপত্যকা আজ এক বিশাল শ্মশানে পরিণত হয়েছে। প্রায় দুই দশক ধরে ‘মুক্তির’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা হামাস অবশেষে শাসনভার ছাড়ার সুর তুলেছে। তবে এই সিদ্ধান্ত কি কোনো মহান ত্যাগ, নাকি নিজের ভুল রাজনীতির রথ যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে, তখন গা বাঁচানোর এক মরিয়া কৌশল? হাজার হাজার মানুষের রক্ত ও ধ্বংসের ওপর দাঁড়িয়ে আজ তাদের এই ‘ক্ষমতা ত্যাগের’ নাটক যেন একটি বিদ্রূপাত্মক ট্র্যাজেডি হয়েই সামনে এসেছে।
ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসে হামাস নিজেকে অবিসংবাদিত নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। ২০০৬ সালে গাজার শাসনভার নেয়ার সময় তাদের হাতে ছিল মানুষের বিপুল আশা। কিন্তু সেই আশার সলিল সমাধি ঘটে যখন তারা একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করার চেয়ে একটি সামরিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে ওঠে। একদিকে ইসরায়েলের পরিকল্পিত জায়নবাদী নৃশংসতা ও দশকের পর দশক ধরে চলা অবৈধ দখলদারিত্ব, অন্যদিকে সেই নৃশংসতার মোকাবিলায় হামাসের ‘শত্রুর খাঁচায় নিজ জনগণকে বন্দি রাখার’ আত্মঘাতী কৌশল- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েলের এই পাশবিকতা কেবল গাজার ঘরবাড়িই ধ্বংস করেনি, তা মানবতাকে কলঙ্কিত করেছে, যার জন্য বিশ্বজুড়ে তারা আজ ধিক্কৃত ও নিন্দিত।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের সেই বহুল আলোচিত ‘আক্রমণ’ ছিল হামাসের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার এক চরম পরাকাষ্ঠা। তারা কি সত্যিই ভেবেছিল যে, একতরফা এক সামরিক ধাক্কা দিয়ে তারা ইসরায়েলের মতো শক্তিশালী ও নৃশংস প্রতিপক্ষকে কাবু করে ফেলবে? এই নির্বুদ্ধিতার খেসারত দিতে হয়েছে গাজার সাধারণ মানুষকে। ইসরায়েলি বোমার নিচে যখন ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারাল, যখন ৯০ শতাংশ বসতবাড়ি ধূলিসাৎ হলো, তখন হামাসের নেতারা সুড়ঙ্গের ভেতরে বা নিরাপত্তার আড়ালে থেকে ‘বিপ্লব’ চালিয়ে গেলেন। এটি কোনো বীরত্ব ছিল না; এটি ছিল লাখ লাখ সাধারণ মানুষের জীবন বাজি রেখে খেলার এক নিষ্ঠুর জুয়া। এই দীর্ঘ ধ্বংসযজ্ঞে ইসরায়েলের এই নিষ্ঠুরতাকে রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিয়ে আমেরিকা যে চরম আপত্তিকর ভূমিকা পালন করেছে, তা বিশ্ববিবেকের কাছে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। মার্কিন প্রশাসনের এই একতরফা সমর্থনই কার্যত ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এই নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে আরও উদ্ধত করে তুলেছে।
আজ যখন গাজায় আর ধ্বংস করার মতো তেমন কিছুই বাকি নেই, যখন হামাসের সামরিক কাঠামোও প্রায় অকার্যকর, ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের ‘শাসনভার হস্তান্তরের’ ঘোষণা অনেকটা ভাঙা নৌকা থেকে লাফ দিয়ে তীরে ওঠার চেষ্টার মতো। তারা এখন ‘অন্তর্বর্তী প্রশাসন’ চায়। কেন? কারণ এখন আর তাদের শাসিত এলাকায় শাসন করার মতো মানুষ অবশিষ্ট নেই। তাদের এই সিদ্ধান্ত কি জনগণের জন্য? না, এটি কেবল সেই ক্ষমতার মোহে অন্ধ গোষ্ঠীটির টিকে থাকার শেষ চেষ্টা। যখন তারা বুঝল যে, এখন ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখা মানে কেবল ধ্বংস নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত বিলুপ্তি, তখনই তারা ‘জাতীয় কমিটি’র দোহাই দিয়ে নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছে।
হামাসের এই অবস্থান পরিবর্তন এক চরম উপহাস। যে রাজনৈতিক দর্শনের মূলে ছিল ‘ইসরায়েল ধ্বংসের’ জেদ, আজ সেই দর্শন নিজেরই ধ্বংসের মুখে পড়ে আত্মসমর্পণ করছে। যারা এতদিন বন্দুকের জোরে সব সত্য ও সমালোচনা স্তব্ধ করে রেখেছিল, আজ তারা যখন শান্তির কথা বলে, তখন তা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। একদিকে ইসরায়েলের নির্বিচার গণহত্যা ও আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদত, আর অন্যদিকে হামাসের এই অদূরদর্শী নেতৃত্ব- এই পুরো বৃত্তটি ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের জন্য নরক তৈরি করেছে। তাদের এই ক্ষমতা বিসর্জন কি সত্যিই শান্তি আনবে, নাকি এটি কেবল সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন করে নিজেদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের এক ধূর্ত খেলা? ইতিহাস সাক্ষী দেবে যে, হামাস গাজাকে ধ্বংসের কিনারায় টেনে নিয়ে যাওয়ার পর এবং ইসরায়েলের অমানবিক আগ্রাসনের মুখে যখন আর কোনো উপায় দেখেনি, তখনই তারা মহানুভবতার মুখোশ পরেছে।
গাজার প্রতিটি ইটের নিচে চাপা পড়ে আছে হামাসের সেই ভুল সিদ্ধান্তের ইতিহাস এবং ইসরায়েলি নৃশংসতার করুণ দলিল। এই হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে ইসরায়েল এবং তাদের মদতদাতা আমেরিকা যেমন পার পাবে না, তেমনি হামাসকেও তাদের এই চরম অবিবেচনা ও নির্বুদ্ধিতার জন্য ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। ক্ষমতা ত্যাগই হোক বা অন্য কোনো নতুন চাল- মানুষের প্রাণের বিনিময়ে যে রাজনীতির ফসল তারা ঘরে তুলতে চেয়েছিল, তা আজ কেবল ছাই আর রক্ত। তাদের এই বিসর্জন কোনো আত্মত্যাগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত দর্শনের এক চূড়ান্ত ও করুণ পরিণতি। যে জনগণ তাদের নিঃস্বার্থভাবে সমর্থন দিয়েছিল, আজ তাদের মৃতদেহের ওপর দিয়ে হামাসের এই ‘ক্ষমতা ত্যাগের’ ঘোষণা যেন এক নির্মম পরিহাস।
ড. এন এইচ এম আবু বকর : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
