×

প্রথম পাতা

দামের চাপে সীমিত আয় ও বেসরকারি চাকরিজীবী

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দামের চাপে সীমিত আয় ও বেসরকারি চাকরিজীবী

প্রতিদিনই মিডিয়াতে দেখছি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর খবর। তাদের খুশি, স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়ে সরকারের বেশ মনযোগ। কিন্তু যারা সীমিত আয়ের মানুষ, যারা বেসরকারি চাকরি করেন, তাদের বাঁচা-মরার খেয়াল কি ওই একই সরকার রাখছেন? মন্ত্রীরা বাজার ঘুরে মিডিয়ার সামনে হাসি মুখ করে বলেন, চালের দাম বাড়েনি, নিত্যপণ্যের দাম বাড়েনি। কিন্তু তারা কি নিজেরা বাজার করেন? দলবল নিয়ে বাজারের পরিস্থিতি দেখতে এলে কি বাজারের প্রকৃত চিত্র দেখতে পাবেন? মধ্যবিত্তদের খেয়ে পরে বেঁচে থাকাটাই দুষ্কর হয়ে গেছে। কর্মসূত্রে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকতে হয়। যে অবস্থা, তাতে ঢাকায় টেকাই মুশকিল হয়ে পড়ছে দিনদিন। কোনো মাসের এমন একটা সপ্তাহ পেলাম না, যে সপ্তাহে কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ে না। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর গোপীবাগ বাজারে সাপ্তাহিক বাজার করতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাশরাফি আলম ভোরের কাগজের কাছে এভাবেই তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

মাশরাফি আলমের কথার রেশ ধরেই পাশে দাঁড়ানো মাকসুদুল ইসলাম বলেন, টিভি-পত্রিকায় দেখি চাষের মাছে ক্ষতিকর উপাদান, মুরগিতে ক্ষতিকর উপাদান, সবজিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক। এসব খেলেই মরতে হবে। নানা অসুখে ভুগতে হবে। জিনিসপত্রের দাম দিনদিন যেভাবে বাড়ছে তাতে তো মনে হয়, এখন না খেয়ে মরতে হবে। মাছ মাংসের দামের কথা আর কী বলব? বাচ্চারা এমনিতেই অপুষ্টিতে ভুগবে।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে সাপ্তাহিক বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মাহবুব জামিল বলেন, সংসারের খরচ ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে। আমাদের বেতন একই জায়গায় আছে। চাল, মুরগি ও ডালসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন সেই টাকায় কয়েক দিনের বেশি চলে না। পরিবারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়েছে, কিন্তু আমাদের মতো বেসরকারি চাকরিজীবীদের নিয়ে কারো ভাবার সময় নেই। দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা বেসরকারি চাকরিজীবীরা অবহেলিত।

শান্তিনগর বাজারে সাপ্তাহিক বাজার করতে আসা ব্যাংকার অনিমেষ রায় বলেন, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়ালেখা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়েছে। মাস শেষে সঞ্চয় তো দূরের কথা, অনেক সময় ধার করে চলতে হচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

বাজার ঘুরে তাদের এই ক্ষোভের কারণ জানা গেল। নিত্যপণ্যের তালিকায় শীর্ষে থাকা চালের বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। বর্ধিত দামেই বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন জাতের চাল। সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। এখানেই শেষ নয়। বেড়েছে আলু, বেগুন, কাঁচামরিচের দামও। বাজারে সবজির দাম স্থিতিশীল থাকলেও বরাবরের মতো উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল রয়েছে মাছের দাম। গতকাল রাজধানীর কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরেও এমন চিত্র মিলেছে। বিক্রেতাদের দাবি, সরবরাহ-সংকটের কারণে মুরগির দাম বেড়েছে। আর চালের বাজারেও এখনো দাম কমার কোনো ইঙ্গিত নেই।

চালের বাজারে স্বস্তি ফেরেনি : চালের বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। গত দুই তিন সপ্তাহ আগে বাড়া চালের দাম এখনো আগের অবস্থায় রয়েছে। চালের খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, মিলপর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও দাম কমানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে খুচরা বাজারেও বাড়তি দাম বহাল রয়েছে।

চাল ব্যবসায়ীরা জানান, গত এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে ২ টাকা বেড়ে এখন বাজারে নাজিরশাইল ও মিনিকেটের মতো সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৮৫ টাকা কেজিতে। পাইজাম, ব্রি-২৮-এর মতো মাঝারি চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকায়। স্বর্ণাগুটি বা মোটা চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বেড়েছে। এই চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা দরে। গত এক মাসের ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চিনিগুঁড়া বা পোলাওয়ের চালের দাম। কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে এখন প্রতি কেজি খোলা পোলাওয়ের চাল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর তথ্য মতে, এক মাসের ব্যবধানে চিকন চালের দাম ১ দশমিক ২৯ শতাংশ, মাঝারি মানের চিকন চালের দাম প্রতি কেজি ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

প্রতি কেজিতে মুরগির দাম বেড়েছে ২০ টাকা; ডিমের দাম কমেছে : কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানীর কাঁচাবাজারে মুরগির দাম বেড়েছে। বাজারে দেখা গেছে, সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে প্রতি কেজি ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এখন প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। এছাড়া সোনালি মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকায়।

ব্যবসায়ীরা জানান, খামার ও পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ায় এবং সরবরাহ ঘাটতির প্রভাবে বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম। আর বিক্রেতারা জানান, মুরগির সরবরাহ কম। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে অনেকে খামারে নতুন করে ব্রয়লার মুরগি তোলা হয়নি। আবার অনেকে লোকসান এড়াতে মুরগি অল্প বড় হতেই বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে করে দাম বেড়েছে। বাজারে গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১২শ থেকে ১৩শ টাকায়। সরবরাহ ও উৎপাদন ভালো থাকায় ডিমের দাম বাড়েনি, বরং কমেছে।

ডিম বিক্রেতার মাসুদ বলেন, ডিমের দাম আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। এক ডজন সাদা ব্রয়লার মুরগির ডিমের দাম ১০০ টাকা আর লাল ডিম ১২০ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা ডজন ছিল।

আলু, রসুন ও কাঁচামরিচের দামও বাড়তি

সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে কাঁচামরিচ, আলু, বেগুন ও রসুনের দাম বেড়েছে। কয়েকদিন আগেও প্রতি কেজি আলু ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। এছাড়া বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি রসুন ৯০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ৬০ থেকে ১৪০ টাকা। টিসিবির তথ্য মতে, এক মাস আগে প্রতি কেজি দেশি রসুনের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ।

দেশি আদা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২০ টাকা বেড়েছে কাঁচামরিচ, বেগুনের দামও। প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১২০ থেকে ১৬০ টাকায় আর বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকায়। বিক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টির কারণে কাঁচামরিচের দাম কিছুটা বেড়েছে।

স্থিতিশীল সবজির বাজার

সবজির বাজারে এখনো কিছুটা স্বস্তিদায়ক পরিবেশ। বাজারে শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন সবজির পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে। অধিকাংশ সবজি প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে কেনা যাচ্ছে। মানভেদে প্রতিকেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা দরে। দেশি শসা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, করলা, চিচিঙ্গা, বরবটি, ধুন্দুল ও কাঁকরোল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ঢ্যঁড়শ ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৩০ টাকা, পটোল ৪০ থেকে ৫০ টাকা, টমেটো ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিপিস চালকুমড়া ও লাউ আকারভেদে ৫০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে।

উচ্চমূল্যে স্থিতিশীল মাছের দাম

বাজারে অধিকাংশ মাছের দাম এখনো অনেক বেশি। যে কারণে স্বস্তি পাচ্ছেন না ক্রেতারা। বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে রুই মাছ আকারভেদে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকা, কাতল ২৩০ থেকে ৫০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা, ট্যাংরা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং টাকি ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া তেলাপিয়া প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০ থেকে ২৩০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, কই ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল মাছ ৭০০ টাকা, দেশি পাঁচমেশালি ছোট মাছ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, মলা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, আকারভেদে রূপচাঁদা ১৪শ থেকে ১৮শ টাকা, বোয়াল আকার অনুযায়ী ৭০০ থেকে হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ইলিশের বাজারে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১২শ টাকা এবং এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২৮শ টাকা কেজিতে। আর দেড় কেজি ওজনের বড় ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ৩৫শ টাকা। এদিকে আগের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে চিংড়ি মাছ। আকার ও জাতভেদে প্রতি কেজি চিংড়ির দাম ৫৫০ থেকে ১৫শ টাকা। কিছু বড় মাছ বিক্রেতারা বলছেন, নদী ও ঘের থেকে সরবরাহের ওপর দাম নির্ভর করে। চিংড়ির সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকায় দাম বেশি। অন্যান্য মাছের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। এই সময় মাছের দাম কিছুটা বেশি থাকে। বর্ষা লাগলে নদীর মাছ বেশি পাওয়া যায়। তখন দাম কিছুটা কমে যায়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

দেশের বাজারে আজকের স্বর্ণের দাম

দেশের বাজারে আজকের স্বর্ণের দাম

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে যা জানালেন প্রতিমন্ত্রী

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে যা জানালেন প্রতিমন্ত্রী

বিশেষ ব্যবস্থায় আজ পরীক্ষা দেবে বগুড়া-নাটোরের ১৮ এইচএসসি পরীক্ষার্থী

বিশেষ ব্যবস্থায় আজ পরীক্ষা দেবে বগুড়া-নাটোরের ১৮ এইচএসসি পরীক্ষার্থী

প্রথম ২৪ ঘণ্টা যে কারণে ডেঙ্গুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ

প্রথম ২৪ ঘণ্টা যে কারণে ডেঙ্গুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App