অশ্রুসিক্ত ইরানিদের অন্তরে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ইরানের রাজধানী তেহরানে গতকাল সোমবার সকালের চিত্রটি ছিল চরম শোকাবহ। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ তার পরিবারের নিহত সদস্যদের শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিশাল শোক র্যালিতে এদিন সকাল থেকে শহরজুড়ে লাখো মানুষের ঢল নামে। শোকাহত এসব মানুষের পরনে ছিল কালো পোশাক, হাতে ছিল খামেনির ছবি, ইরানের জাতীয় পতাকা এবং প্রতিশোধের প্রতীকী লাল পতাকা। বুকে আঘাত করে মাতম করেন তারা। এ সময় অনেককেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়। মুহুর্মুহু স্লোগানে কেঁপে ওঠে তেহরান।
সোমবার সকাল ৬টায় (গ্রিনিচ মান সময় ২টা ৩০ মিনিট) তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্স থেকে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোক র্যালি শুরু হয়। পরে এটি দামাভান্দ স্ট্রিট, ইমাম হুসেন স্কয়ার, ইনকিলাব স্ট্রিট, আজাদি স্ট্রিট, আজাদি স্কয়ার এবং মেহরাবাদ বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত শহীদ লাশগরি হাইওয়ে হয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। শোক র্যালিটি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এ সময় তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। আগত সাধারণ মানুষের কণ্ঠে তীব্র শোক ও চোখে জল দেখা যায়। তাদের কাছে এটি শুধুমাত্র প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর মুহূর্তই ছিল না, বরং খামেনিকে তারা ইসলামী বিপ্লবের রক্ষক এবং বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখেন।
আয়োজকদের দাবি, এটি দেশটির আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জনসমাগম। প্রেস টিভি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মূলত খামেনির শোক অনুষ্ঠানে ইরানে বসবাসকারীরা তো বটেই, বিদেশ থেকে প্রবাসী ইরানিরাও ছুটে আসেন ঐতিহাসিক এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। এমনই একজন মাজিয়া। খামেনির শোক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যুক্তরাজ্য থেকে ৪ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ইরানে এসেছেন তিনি। রবিবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মাজিয়া বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি বিশ্বকে বলতে যে ৪ হাজার বছরের পুরনো একটি সভ্যতাকে কেউ ধ্বংস করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি যদি এই সভ্যতাকে ধ্বংস করতে চায়, সেক্ষেত্রে সে আসলে নিজের দেশকেই ধ্বংস করতে চায়।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ ইরানকে আরো শক্তিশালী করেছে, ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। যারা অন্য দেশের সম্পদ দখল করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আমাদের শক্তভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন। পশ্চিমা গণতন্ত্রের কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। সিরিয়া, ইরাক এবং আফগানিস্তানের উদাহারণ আমাদের চোখের সামনেই আছে।’ এদিকে রবিবার তেহরানে খামেনির জানাজায় ট্রাম্পকে হত্যার ডাক দেয়া হয়েছে। তেহরানের একটি জনাকীর্ণ প্রার্থনা অনুষ্ঠানে খামেনির কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে এই স্লোগান দেয়া হয়।
নিহত খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইরান। গতকাল ছিল তৃতীয় দিন। এর আগের দিন রবিবার তেহরানে খামেনির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজাস্থলে শোকাহতদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান দিতে দেখা যায়। ‘যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস হোক’ ও ‘ইসরায়েল ধ্বংস হোক’- এমন স্লোগানের পাশাপাশি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার দাবি জানান অনেকেই। সেখানে জানাজাস্থলে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ তার পরিবারের আরো চার সদস্যের কফিনও সাজানো ছিল। শোকাবহ এই আয়োজনে সেখানে রাখা ছিল খামেনির মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানির একটি ছোট কফিনও।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ তার মেয়ে সাইয়েদা বুশরা হোসেইনি খামেনি, মেয়ের জামাই মেসবাহ-ওল-হোদা বাঘেরি, পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল ও নাতনি জাহরা। ঘটনার আকস্মিকতায় ও শিশু জাহরার ছোট কফিনটি শোকসভায় এক অত্যন্ত মর্মস্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা করে। তখন জানাজায় উপস্থিত লাখো শোকার্ত জনতা অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধের ওই স্লোগান দেন।
রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিন নিয়ে যাওয়া হবে কোম নগরীতে। আগামীকাল বুধবার কফিন নেয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে শোকযাত্রা হবে নাজাফ ও কারবালা শহরে। সেখানেও শোকাহত মানুষ তার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন এবং জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে ৯ জুলাই জন্মস্থান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে তার লাশ দাফন করার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, টানা ৩৬ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে বিরোধের জেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। অভিযানের প্রথম দিনই তেহরানে স্ত্রী, পুত্রবধূ এবং নাতনিসহ নিহত হন খামেনি। একই হামলায় খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন আছেন। খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবাকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
তবে ইরানের সীমানা ছাড়িয়েও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রভাব ছিল বিস্তৃত। মুসলিম বিশ্বের অনেকের কাছে তিনি ছিলেন বিদেশি আধিপত্যবিরোধী প্রতিরোধের এক জোরালো কণ্ঠস্বর। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, ‘প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব তখনই, যখন জাতিগুলো নিজেদের মানুষ, নিজেদের জ্ঞান, নিজেদের সংস্কৃতি ও নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখবে।’
এই কারণেই তেহরানের শোকমঞ্চে জমায়েত হওয়া কোটি মানুষের চোখে অশ্রু থাকলেও, সেই অশ্রুর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল আরেকটি অঙ্গীকার- তাদের বিশ্বাসের নেতা চলে গেলেও তার দেখানো পথ, তার প্রতিরোধের ভাষা এবং তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার তারা বয়ে নিয়ে যাবে আগামী প্রজন্মের কাছে।
