হলান্ডের হাসি, স্বপ্নভঙ্গ হলো নেইমারের
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপের মঞ্চে একই রাতে লেখা হলো দুই ভিন্ন গল্প। একদিকে আর্লিং হলান্ডের নেতৃত্বে নরওয়ে পৌঁছে গেল ইতিহাসের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে। অন্যদিকে শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামা নেইমার জুনিয়রের স্বপ্ন থেমে গেল শেষ ষোলোতেই। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নরওয়ের ২-১ গোলের জয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়- এটি এক প্রজন্মের উত্থান আর আরেক প্রজন্মের বিদায়ের প্রতীক হয়ে থাকল।
ম্যাচজুড়ে হলান্ডকে খুব বেশি চোখে পড়েনি। ব্রাজিল বলের দখলে এগিয়ে ছিল, সুযোগও তৈরি করেছিল বেশি। শুরুতেই পেনাল্টি পেয়েও ব্রুনো গিমারায়েস গোল করতে ব্যর্থ হন। নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নিয়ল্যান্ড সেই শট ঠেকিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। এরপর ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, মার্তিনেল্লি ও এন্দ্রিক একের পর এক সুযোগ নষ্ট করলে ব্রাজিলের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।
আর সেই চাপের মুহূর্তেই নিজের সবচেয়ে বড় শক্তির পরিচয় দেন হলান্ড। পুরো ম্যাচে বলের সংস্পর্শে খুব বেশি না এলেও সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন ধৈর্য নিয়ে। ৭৯ মিনিটে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের নিখুঁত ক্রসে গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসকে হারিয়ে দুর্দান্ত হেডে নরওয়েকে এগিয়ে দেন তিনি। ম্যাচের বাকি সময়ে ব্রাজিল যখন মরিয়া হয়ে সমতায় ফেরার চেষ্টা করছে, তখন ৯০ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে নিচু বাঁ-পায়ের শটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ম্যাচ কার্যত শেষ করে দেন।
দুটি গোলই ছিল একজন বিশ্বমানের স্ট্রাইকারের স্বাক্ষর। প্রথমটি ছিল পজিশনিং, টাইমিং ও হেডিং দক্ষতার নিখুঁত উদাহরণ। দ্বিতীয়টি ছিল আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত এবং ফিনিশিংয়ের প্রতিচ্ছবি। বড় ম্যাচে বড় খেলোয়াড়েরা কীভাবে পার্থক্য গড়ে দেন, হলান্ড তার আরেকটি প্রমাণ রাখলেন।
ম্যাচ শেষে হলান্ড বলেন, তিনি জানেন না কীভাবে এমন সুযোগগুলো বারবার গোলে পরিণত করতে পারেন। এটি তিনি সৃষ্টিকর্তার উপহার বলেই মনে করেন। তবে তার আসল শক্তি হলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখা। ব্রাজিলের বিপক্ষে সেটিই দেখা গেল। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করে মাত্র ১১ মিনিটের ব্যবধানে তিনি বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত পারফরম্যান্স উপহার দিলেন।
এই জোড়া গোলে চলতি বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৭। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তিনি লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের সমান উচ্চতায় উঠে আসেন। চার ম্যাচে তিনবার জোড়া গোল করার কৃতিত্বও গড়েছেন নরওয়ের এই অধিনায়ক। শুধু গোলই নয়, তার নেতৃত্ব পুরো দলকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। শৃঙ্খলিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং সুযোগ কাজে লাগানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনিই ছিলেন দলের প্রধান অনুপ্রেরণা।
নরওয়ের এই জয় কেবল একটি বড় দলকে হারানোর গল্প নয়। এটি তাদের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অর্জন। ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছিল তারা। ২৮ বছর পর আবারো ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল ইউরোপের দলটি। আরো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রাজিলের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচ খেলেও এখনো হারেনি নরওয়ে-তিন জয় ও দুই ড্র তাদের অনন্য রেকর্ড।
ব্রাজিলের বিপক্ষে এই জয়কে নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দিন বলে উল্লেখ করেছেন হলান্ড নিজেই। ম্যাচ শেষে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই মুহূর্তটি উপভোগ করা উচিত, কারণ এমন দিন বারবার আসে না। তার বিশ্বাস, এই সাফল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নরওয়েজিয়ান ফুটবলারদের নতুন স্বপ্ন দেখাবে।
হালান্ড যখন নরওয়ের ইতিহাস রচনার নায়ক, তখন ম্যাচের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল এক বেদনাভারাক্রান্ত অধ্যায়। চোট কাটিয়ে পুরোপুরি ফিট না থাকায় পুরো টুর্নামেন্টেই সীমিত সময় মাঠে নেমেছেন নেইমার। নরওয়ের বিপক্ষেও তিনি শুরু করেননি। ৬৭ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে আক্রমণে কিছুটা গতি আনলেও ম্যাচের ভাগ্য আর বদলাতে পারেননি। যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করেন তিনি। তবে সেটি কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে, হার এড়াতে পারেনি।
শেষ বাঁশি বাজতেই অশ্রæসিক্ত হয়ে পড়েন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। পরে আবেগঘন কণ্ঠে জানিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার পথচলা এখানেই শেষ। ২০১০ সালে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছিল তার। ১৬ বছর পর একই মাঠেই শেষ হয়ে গেল ব্রাজিলের জার্সিতে তার দীর্ঘ যাত্রা। যেন শুরু আর সমাপ্তি একই ঠিকানায় এসে মিলল।
নেইমার ব্রাজিলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল ও ৫৮ অ্যাসিস্ট করে বিদায় নিচ্ছেন। চারটি বিশ্বকাপ খেলেও অধরা থেকে গেল সবচেয়ে কাক্সিক্ষত ট্রফিটি। ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপ এবং ২০১৬ অলিম্পিকের স্বর্ণপদক তার সাফল্যের তালিকায় থাকলেও বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ইনজুরি, দুর্ভাগ্য এবং অসময়ে ছিটকে পড়া- এই তিনটি বিষয় বারবার তার বিশ্বকাপ-স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে হলান্ডের সামনে এখন নতুন দিগন্ত। প্রথম বিশ্বকাপ খেলেই সাত গোল, গোল্ডেন বুটের দৌড়ে যৌথ শীর্ষে অবস্থান এবং নরওয়েকে প্রথমবারের মতো শেষ আটে তোলার কৃতিত্ব- সব মিলিয়ে তিনি এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় নায়ক। তার নেতৃত্বে নরওয়ে আর চমকের দল নয়, শিরোপারও শক্ত দাবিদার। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের একটি রাত তাই দুই মহাতারকার জন্য লিখে রাখল দুই বিপরীত গল্প। একজন ইতিহাস গড়ে নতুন স্বপ্নের পথে এগিয়ে গেলেন, আর অন্যজন অপূর্ণ বিশ্বকাপ-স্বপ্ন বুকে নিয়েই শেষ করলেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দীর্ঘ অধ্যায়।
