লাল সমুদ্রে থামল হলুদ ঢেউ
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বকাপে অঘটনের গল্প নতুন নয়। তবে কিছু কিছু ম্যাচ শুধু একটি দলের বিদায়ের গল্প হয়ে থাকে না, বদলে দেয় পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ। নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রবিবার দিবাগত রাতে তেমনই এক অধ্যায়ের জন্ম দিল নরওয়ে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছে ইউরোপের দেশটি। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আর্লিং হলান্ড। দ্বিতীয়ার্ধে তার জোড়া গোল ব্রাজিলের ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে, একইসঙ্গে বিশ্বকাপের শিরোপা দৌড়ের হিসেবও নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছে।
কাগজে-কলমে ব্রাজিলই ছিল ফেভারিট। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ব্রুনো গিমারাইস, কাসেমিরো, আলিসন বেকার, পরে বদলি হিসেবে নেইমার- তারকায় ঠাসা দলটির নেতৃত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলত্তি। অন্যদিকে নরওয়ের মূল ভরসা ছিল হলান্ড, অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড এবং দলগত শৃঙ্খলা। শেষ পর্যন্ত ফুটবল আবারো মনে করিয়ে দিল, বড় নামের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং সুযোগ কাজে লাগানোর সামর্থ্য।
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, নরওয়ে আবেগে ভেসে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়বে না। তারা অপেক্ষা করবে, ব্রাজিলকে খেলতে দেবে, তারপর সুযোগ বুঝে আঘাত করবে। এই পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হয়ে ওঠে।
ম্যাচের দশম মিনিটেই এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল ব্রাজিল। মাতেউস কুনিয়াকে ফাউল করলে ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টি দেন রেফারি। কিন্তু ব্রুনো গিমারাইসের শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক আরিয়ান নিয়ুলান্ড। পরে ম্যাচের ফল বিবেচনায় এই মুহূর্তটিই হয়ে ওঠে অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট।
পেনাল্টি মিসের পরও ব্রাজিল বল দখলে আধিপত্য বজায় রাখে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি ও কাসেমিরো একের পর এক আক্রমণ গড়ে তুললেও শেষ মুহূর্তে হয় গোলরক্ষকের দৃঢ়তা, নয়তো নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তে ব্যর্থ হয় তারা। প্রথমার্ধে নরওয়ের গোলরক্ষক কয়েকটি অসাধারণ সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। অন্যদিকে নরওয়ে তাড়াহুড়ো করেনি। তারা জানত, ব্রাজিল যত বেশি সামনে উঠবে, তত বেশি জায়গা তৈরি হবে পাল্টা আক্রমণের জন্য। সেই লক্ষ্যেই বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ধৈর্যের সঙ্গে ম্যাচ এগিয়ে নিয়ে যায় তারা।
দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তরুণ এন্দ্রিককে নামিয়ে গতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন আনচেলত্তি। কিন্তু একা গোলরক্ষককে সামনে পেয়েও সুযোগ নষ্ট করেন এই ফরোয়ার্ড। কিছুক্ষণ পর নেইমারকেও মাঠে নামানো হয়। তবে তখনো ম্যাচ গোলশূন্য। এই সময়েই নরওয়ে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তির পরিচয় দেয়। রক্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রেখে দ্রুত উইং দিয়ে আক্রমণে ওঠা এবং নির্ভুল ক্রস- এই পরিকল্পনা ব্রাজিলের রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলে। ম্যাচের ৭৯তম মিনিটে আন্দ্রেয়াস শেলদ্রুপের নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে গোল করেন হলান্ড। দীর্ঘ সময় ধরে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেও গোল না পাওয়া ব্রাজিল মুহূর্তেই চাপে পড়ে যায়।
গোল হজমের পর স্বাভাবিকভাবেই আরো মরিয়া হয়ে ওঠে ব্রাজিল। কিন্তু এই মরিয়া মনোভাবই উল্টো তাদের রক্ষণে আরো ফাঁকা জায়গা তৈরি করে দেয়। আর সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ভুল করেননি হলান্ড। নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে নিচু জোরালো শটে আলিসনকে পরাস্ত করে নিজের এবং দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। ম্যাচ কার্যত সেখানেই শেষ হয়ে যায়।
এই জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল নরওয়ের সুশৃঙ্খল ও বাস্তববাদী ফুটবল। পুরো ম্যাচে বলের দখলে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও নরওয়ে কখনোই নিজেদের পরিকল্পনা থেকে সরে যায়নি। তারা জানত, ব্রাজিল আক্রমণে যত বেশি খেলোয়াড় তুলবে, পাল্টা আক্রমণের সুযোগ তত বাড়বে। তাই অযথা ঝুঁকি না নিয়ে রক্ষণকে সুসংগঠিত রেখে অপেক্ষা করেছে সঠিক মুহূর্তের।
নরওয়ের আরেকটি বড় শক্তি ছিল গোলরক্ষক আরিয়ান নিয়ুলান্ড। ম্যাচের শুরুতেই ব্রুনো গিমারাইসের পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি শুধু একটি গোলই বাঁচাননি, সতীর্থদের আত্মবিশ্বাসও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেন। এরপর ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, মার্তিনেল্লি, এন্দ্রিকদের একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ম্যাচের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। হলান্ড জোড়া গোল করে আলো কেড়ে নিলেও নরওয়ের এই ঐতিহাসিক জয়ে গোলরক্ষকের অবদান ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে পার্থক্য গড়ে দেন আর্লিং হলান্ড। পুরো ম্যাচে ব্রাজিলের দুই সেন্টারব্যাককে ব্যস্ত রেখে খুব বেশি সুযোগ পাননি তিনি। কিন্তু যেসব সুযোগ পেয়েছেন, সেগুলোই কাজে লাগিয়েছেন বিশ্বমানের স্ট্রাইকারের মতো। প্রথম গোলটি আসে নিখুঁত হেডে, দ্বিতীয়টি দূরপাল্লার নিচু শটে। একজন ফরোয়ার্ডের কার্যকারিতা কেমন হওয়া উচিত, সেটাই দেখিয়েছেন নরওয়ের অধিনায়কসুলভ এই স্ট্রাইকার।
ব্রাজিলের বিদায়ের পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, সুযোগ নষ্ট। ম্যাচের শুরুতেই পেনাল্টি মিস, এরপর এন্দ্রিকের একক সুযোগ নষ্ট, ভিনিসিয়ুস ও মার্তিনেল্লির ব্যর্থতা- সব মিলিয়ে গোল করার যে সুযোগগুলো তারা তৈরি করেছিল, তার খুব কমই কাজে লাগাতে পেরেছে। দ্বিতীয়ত, আক্রমণে তাড়াহুড়ো। গোলের জন্য মরিয়া হতে গিয়ে অনেক সময় পরিকল্পনা হারিয়ে ফেলেছে ব্রাজিল। ডান-বাম দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ হলেও শেষ পাস কিংবা ফিনিশিংয়ে ছিল অস্থিরতা। তৃতীয়ত, রক্ষণে মনোযোগের ঘাটতি। ৭৯ মিনিটে হলান্ডকে বক্সের ভেতর প্রায় অরক্ষিত অবস্থায় হেড করার সুযোগ দেয়া এবং দ্বিতীয় গোলে ডি-বক্সের বাইরে তাকে শট নেয়ার পর্যাপ্ত সময় দেয়া- দুই ক্ষেত্রেই ব্রাজিলের রক্ষণভাগের ভুল স্পষ্ট।
কার্লো আনচেলত্তির পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন উঠতেই পারে। এন্দ্রিক ও পরে নেইমারকে নামিয়ে তিনি আক্রমণের ধার বাড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নেইমারকে আরো আগে নামানো উচিত ছিল কি না, সেই বিতর্কও তৈরি হয়েছে। শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান কমালেও ম্যাচের ভাগ্য বদলানোর মতো সময় তখন আর হাতে ছিল না।
এই ম্যাচের পর বিশ্বকাপে হলান্ডের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তিনি লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের কাতারে পৌঁছে গেছেন। তবে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়েও বড় বিষয় হলো, তার নেতৃত্বে নরওয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল নরওয়ে। ২৮ বছর পর আবারো একই ব্যবধানে জয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে নিজেদের অপরাজিত রেকর্ডও ধরে রাখল ইউরোপের দলটি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনো নকআউট পর্বে জয়ের স্বাদ পায়নি নরওয়ে। এবার তারা টানা দুই নকআউট ম্যাচ জিতে শেষ আটে পৌঁছে নতুন ইতিহাস লিখল।
ব্রাজিলের বিদায় শুধু একটি বড় দলের বিদায় নয়; এটি পুরো টুর্নামেন্টের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ছিটকে পড়ায় শিরোপার দৌড় আরো উন্মুক্ত হয়ে গেল। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও ইতোমধ্যে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা দলগুলোর সঙ্গে নরওয়েও এখন বাস্তব দাবিদার হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে।
একসময় যাদের ‘ডার্ক হর্স’ বলা হচ্ছিল, সেই নরওয়ে এখন আর শুধু চমকের দল নয়। শক্তিশালী রক্ষণ, কার্যকর পাল্টা আক্রমণ, হলান্ডের দুর্দান্ত ফর্ম এবং ওডেগার্ডের নেতৃত্ব- সব মিলিয়ে তারা শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলোর জন্যও বড় হুমকি।
২০০২ সালে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে নকআউট পর্বে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বারবার থেমেছে ব্রাজিল। ২০০৬ সালে ফ্রান্স, ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস, ২০১৪ সালে জার্মানি, ২০১৮ সালে বেলজিয়াম, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়া- আর এবার সেই তালিকায় যোগ হলো নরওয়ে। অভিজ্ঞ কোচ কার্লো আনচেলত্তিকেও দিয়ে কাটল না সেই অভিশাপ। অন্যদিকে, নরওয়ের জন্য এটি কেবল একটি জয় নয়, বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের নতুন শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা। আর্লিং হলান্ডের নেতৃত্বে শৃঙ্খলিত, আত্মবিশ্বাসী ও কার্যকর ফুটবল খেলেই তারা বুঝিয়ে দিয়েছে- শুধু তারকানির্ভরতা নয়, দলগত পরিকল্পনাই বড় ম্যাচ জেতায়।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এবার একের পর এক অঘটন ঘটছে। সেই তালিকায় সবচেয়ে বড় সংযোজন ব্রাজিলের বিদায়। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায়ে শিরোপার সমীকরণ যেমন নতুন রূপ পেল, তেমনি নরওয়েও জানিয়ে দিল- তারা আর কেবল চমকের দল নয়, শিরোপার লড়াইয়েও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়ার দাবিদার।
