বৃষ্টি-বন্যায় অস্থির বাজার, জীবনযাত্রায় বাড়ছে চাপ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
টানা ভারী বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার প্রভাবে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে ডিম, ব্রয়লার ও সোনালি মুরগি, পেঁয়াজ, আদা, রসুনের দাম। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সব ধরনের সবজির দাম।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে ডজনপ্রতি ডিমের দামও বেড়েছে প্রায় ২০ টাকা।
বরাবরের মতো, সরবরাহ কম থাকায় পণ্যের দাম বেড়েছে বলে দাবি করছেন বিক্রেতারা। তারা বলছেন, বন্যার পানিতে বিভিন্ন জেলার সবজির খেত তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নেই। পাশাপাশি অনেক মুরগির খামারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। মাছ বিক্রেতারা বলছেন, গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় সব ধরনের মাছের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে।
সরবরাহ কমে বেড়েছে সবজির দাম : বৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে সবজির বাজারে। বাজারে সবজির সরবরাহ কমেছে আর প্রায় সব ধরনের সবজির দামই বেড়ে গেছে। অধিকাংশ সবজির দামই কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে। কোনো কোনো সবজির দাম কেজিতে ৬০ টাকা পর্যন্তও বেড়েছে। যেমন কয়েক দিন আগের ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজির হাইব্রিড শসা এখন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৬০ টাকায়। আর দেশি শসা কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। একই অবস্থা বেগুন ও করলার ক্ষেত্রেও। ৮০ টাকা কেজির বেগুন ও করলা এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। এ ছাড়া ফুলকপি ও বরবটি বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকা কেজি দরে। ঢ্যাঁড়স, ঝিঙে ও চিচিঙ্গার মতো সবজি, যা গত সপ্তাহে ৬০-৮০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। লাউয়ের পিস বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, যা আগে ছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা। প্রতি কেজি কাঁচা পেঁপে ৪০ টাকা, আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা, কচু আকার ভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমদানীকৃত টমেটোর দাম কিছুটা কমলেও এখনো চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি টমেটো ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা জানান, বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সবজির খেত প্লাবিত হয়েছে। এতে সবজি পঁচে যাওয়া এবং পরিবহনসংকটের কারণে বাজারে এখন সবজির সরবরাহ কম। এই প্রাকৃতিক সংকটের সুযোগে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী আবার অতিরিক্ত দাম হাঁকছেন। বাজারে কাঁচা মরিচের দামও বেড়েছে। কয়েক দিন আগে এক কেজি কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল কাঁচা মরিচ ১৮০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হঠাৎ দাম বাড়া প্রসঙ্গে গোপীবাগের সবজি বিক্রেতার আল-আমিন মিয়া বলেন, বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানিতে সবজির খেত তলিয়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে। আগে যেখানে প্রতিদিন ১০০ কেজি সবজি আসত, এখন আসছে ৬০ কেজি। অথচ বাজারে চাহিদা আগের মতোই আছে। ফলে পাইকারিতেই আমাদের চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে এই দাম কমার কোনো সম্ভাবনাও নেই বলে জানান এই বিক্রেতা।
ঊর্ধ্বমুখী মুরগি ও ডিমের দাম
গতকাল বাজারে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় এবং সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও ব্রয়লার ১৭০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও বৃষ্টির পর থেকেই দাম বাড়তে শুরু করেছে। তবে দেশি মুরগির দামে তেমন পরিবর্তন হয়নি। এটি এখনো ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
শান্তিনগর বাজারের এক মুরগি বিক্রেতা জানান, বর্তমানে খামারিদের মুরগির সরবরাহ কমে গেছে। বাজারে মূলত বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মুরগি আসছে, যার দাম তুলনামূলক বেশি।
মুরগির দাম বাড়ার পাশাপাশি ডিমের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত সপ্তাহে যেখানে ডজনপ্রতি ডিম ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেখানে বর্তমানে একই ডজন কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা।
বিক্রেতাদের দাবি, মুরগির দাম বাড়ায় অনেক ক্রেতা বিকল্প হিসেবে ডিম কিনছেন। ফলে চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়েছে।
মাছের দামও ঊর্ধ্বমুখী
মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী ভাব লক্ষ্য করা গেছে। পাঙাশ মাছ কেজিপ্রতি আকারভেদে ২২০ থেকে ২৮০ টাকা, মাঝারি ও বড় সাইজের তেলাপিয়া কেজি ২২০ থেকে ২৬০ টাকা, রুই ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা, কাতল ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, চাষের কৈ মাছ ২২০ থেকে ২৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ি আকারভেদে ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের দাবি, গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় সব ধরনের মাছের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে।
আদা-রসুনেও কমেনি চাপ
চলতি অর্থবছরের বাজেটে আদা, রসুনসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের শুল্ক কমানো হলেও বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। দাম বেড়েছে দেশি রসুনের। বর্তমানে আদা ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি, এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি দেশি রসুন ৯০ থেকে ১৪০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ১০০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চায়না রসুন ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে আলুর দাম এখনো ৩০ টাকার আশপাশে রয়েছে। মসলা বাজারেও তেমন স্বস্তি নেই। লবঙ্গ, দারুচিনি, জিরা, এলাচ, গোলমরিচ ও কিশমিশ আগের উচ্চমূল্যেই বিক্রি হচ্ছে।
চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরেনি
সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে সরু ও মোটা দুই ধরনের চালের দামই বেড়েছে। সরু চাল (নাজির/মিনিকেট)-এর সর্বনি¤œ দাম ৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৭২ টাকায় উঠেছে। বর্তমানে এ চাল প্রতি কেজি ৭২ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া, মোটা চাল (স্বর্ণা/চায়না ইরি)-এর সর্বনিম্ন দাম ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মাঝারিমানের চাল পাইজাম/লতার দাম বাড়েনি। প্রতি কেজি পাইজাম/লতা বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬৮ টাকার মধ্যে।
পাইজাম/লতার দাম না বাড়লেও আগের দামেই তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা, আটাশ ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি দেশি মসুর ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, আমদানি করা ডাল ১২০ টাকা, ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা এবং চিনি ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
