মহাবিপর্যয় ঘটাবে এএমআর
মুড়িমুড়কির মতো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার যে মহাবিপর্যয় ডেকে এনেছে- এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (ডাব্লিউএইচও) বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য যা করণীয় সেই উদ্যোগগুলো খুব একটা চোখে পড়ে না।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত। যা মূলত অনুজীবের বিরুদ্ধে কার্যকর। তবে ভাইরাস জনিত সমস্যার জন্য নয়। অথচ এসব আমলে না নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক মুড়িমুড়কির মতো ব্যবহারের ফলে, প্রজন্মের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত প্রোটোকল রয়েছে। যা ধাপে ধাপে অনুসরণ করা লাগে। কিন্তু তা যে মানা হয়নি, বর্তমান পরিস্থিতি দেখে তা স্পষ্টই বোঝা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর জন্য ওষুধ নয়, এর সহজলভ্যতা, ব্যবহারে সক্ষমতার জ্ঞানের অভাবেই মূলত দায়ী। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে আইসিইউতে ভর্তি প্রতি ১০ জনের ৪ জনেরই বর্তমানে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে দেশে রোগীদের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে। দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ৪০ হাজার রোগী এএমআর সংক্রমণের কারণে মারা যাচ্ছেন। তুলনামূলকভাবে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে এটি প্রতিবছর ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার। আর আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, যদি এএমআর নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে।
বাংলাদেশে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত গুরুতর অসুস্থ ৪৯ জন শিশুর নমুনা বিশ্লেষণে দেখতে পায় অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা ৯৬ শতাংশ কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংকট নয়; এটি মানবসভ্যতার জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা। অ্যান্টিবায়োটিক ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারালে অস্ত্রোপচার, ক্যানসার চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন কিংবা সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। যা আগামীর সংকটে অশনিবার্তা বহন করছে।
তথ্য উপাত্ত-গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়াবহতা : ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ডাব্লিউএইচও’র ‘গেøাবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সার্ভিলেন্স রিপোর্ট ২০২৫’-এ বলা হয়েছে, মারাত্মক সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ইমিপেনেম। যার বিরুদ্ধে ‘অ্যাসিনেটোব্যাকটার এসপিপি’ নামক ব্যাকটেরিয়ার ৯৭ শতাংশ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি
হয়েছে। এছাড়া, রক্তপ্রবাহ ও মূত্রনালির সংক্রমণের জন্য দায়ী ‘ই. কোলাই’ ও ‘ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া’ ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে থার্ড জেনারেশন সেফালোস্পোরিন ও ফ্লুরোকুইনলোনসের মতো অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধ ক্ষমতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিবেদনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে সর্বোচ্চ রেজিস্ট্যান্স হারের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর এক গবেষণায়ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ভর্তি হওয়া নবজাতকদের ৮১ শতাংশই কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি নামক ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত হচ্ছে, যা ডাব্লিউএইচও’র তালিকায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত একটি রোগজীবাণু। সংক্রমিত এসব নবজাতকের ৭০ শতাংশই হাসপাতালে ভর্তির ৪৮ ঘণ্টা পর জীবাণুর সংস্পর্শে এসেছে, যা হাসপাতাল থেকে ছড়ানো সংক্রমণের উচ্চহারকে নির্দেশ করে। শুধু নবজাতকই নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের আইসিইউতে থাকা ৬০ শতাংশ রোগীর শরীরেও কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী এন্টারোব্যাকটেরেলস (সিআরই) পাওয়া গেছে। গবেষণায় মা ও শিশুর ওপর পর্যবেক্ষণেও উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে। প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু জন্মের প্রথম বছরের মধ্যে সিআরই এবং প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু এক্সটেন্ডেড-স্পেকট্রাম সেফালোস্পোরিন-প্রতিরোধী এন্টারোব্যাকটেরেলস (ইএসসিআরই) দ্বারা সংক্রমিত হয়। এক বছর বয়স হওয়ার আগেই এসব শিশুর ৮০ শতাংশেরও বেশি অন্তত একবার অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেছে, যা তাদের শরীরের মাইক্রোবায়োমের ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিরোধী জীবাণুর বিকাশ ঘটাচ্ছে।
জগদ্বিখ্যাত ‘দ্য ল্যান্সেট’ ক্লিনিক্যাল মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিড ফর গেøাবাল সলিউশন’ শীর্ষক একটি বিশ্লেষণধর্মী বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে বিশ্বের ২৬ জন বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও ওষুধবিশেষজ্ঞ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তারা বলেছেন, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স যে হারে বাড়ছে, তাতে হয়তো দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে মানুষ সংক্রামক রোগে অসহায় মৃত্যুবরণ করবে। রেজিস্ট্যান্ট সংক্রামক ব্যাধির সংখ্যা আগামী ৫ বছরে জ্যামিতিক হারে বাড়বে।
স্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রভাব ফেলছে অর্থনীতিতেও :
এএমআর সমস্যা শুধুমাত্র দেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নয়, অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। গবেষণা অনুযায়ী, এএমআর’র কারণে চিকিৎসা ব্যয় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগীরা এক বছরেই প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা বেশি খরচ করছেন, যেখানে সাধারণ সংক্রমণে এই ব্যয় কম হওয়া উচিত ছিল।
অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের কার্যকারিতা হারানোর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অবাধ বিক্রি, অপ্রয়োজনীয় ও ভুল প্রয়োগ, ওষুধের কোর্স সম্পূর্ণ না করা এবং খামারে যথেচ্ছ ব্যবহার। ‘ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিকস অ্যাক্ট, ২০২৩’ অনুযায়ী প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিষিদ্ধ এবং এর ব্যত্যয়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। অথচ তা জানা নেই অনেক ফার্মেসি বিক্রেতারই। ২০২২ সালে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ ফার্মেসি বিক্রেতাই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে অবগত নন।
পশুপালন খাতেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশে মুরগি, গরু ও মহিষের খামারে রোগ প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। কৃষি ও পশুপালন অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাচ্ছে। এটি মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সাহায্য করছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বাজার থেকে সংগৃহীত মুরগির নমুনায় ১৭টি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী সালমোনেলা স্ট্রেইন পাওয়া গেছে।
ওষুধের অপব্যবহার নিয়ে আবিষ্কারকই সতর্ক করেছিলেন :
স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯২৮ সালে পেনিসিলিয়াম আবিষ্কার করেছিলেন, যার প্রথম প্রয়োগ হয়েছিল তার আরো ১২ বছর পর। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তিনি ১৯৪৫ সালে শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। সেই পুরস্কার নেয়ার ভাষণে ফ্লেমিং এই ধরনের ওষুধের অপব্যবহার নিয়ে তখনই সতর্ক করেছিলেন। সেই সময় তার সেই কথাকে সবাই তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এর ঠিক ৫ বছর পর তার ভবিষ্যৎবাণী মিলে গেল, যখন পেনিসিলিয়াম ব্যর্থ হলো কিছু কিছু ক্ষেত্রে। এই ব্যর্থতার ফলে নতুন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তাও বেড়ে গেল আরো কয়েকগুণ। যদিও কিছু দিনের মধ্যে সেগুলোর কার্যকারিতাও ক্রমশ কমতে থাকল। একটা অ্যান্টিবায়োটিক কতদিন কার্যকর থাকবে, তা অনুমান করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন :
স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন জাতীয় কমিটির সভাপতি বাংলাদেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক বিএসএমএমইউ) সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব ভোরের কাগজকে বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের যত্রতত্র ব্যবহার ও অপ্রয়োজনীয় প্রেসক্রিপশন জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তার মতে, সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসকদের অতিরিক্ত ওষুধ লেখার প্রবণতাই দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের মূল কারণ। ফার্মেসি থেকেও প্রেসক্রিপশন ছাড়া সব ধরনের ওষুধ কিনতে পারছে মানুষ। এ কারণে অসুস্থ হলে মানুষ চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ফার্মেসিতে যাচ্ছে। ফার্মেসির লোকও কোনো কিছু যাচাই-বাছাই না করে ওষুধ এমন কী অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দিচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ মনে করেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঘুমের ওষুধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণে আনার মতোই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রিতেও কঠোর নীতি প্রণয়ন জরুরি। তার মতে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ একটি বৈশ্বিক সংকট, এটি একটি বহু-খাতীয় সমস্যা যার সমাধান সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাভিত্তিক পদক্ষেপ ছাড়া সম্ভব নয়।
তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, হাসপাতাল থেকে সংক্রমিত হলে জীবাণু বেশি প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। কারণ হাসপাতালে রোগীদের ওপর প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে আইসিইউতে থাকা রোগীর ক্ষেত্রে মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু পাওয়া যায়। ভর্তি ও বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয়া রোগীর মধ্যে তুলনা করলে দেখা যায় ভর্তি রোগীদের মধ্যে বেশি জীবাণু রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে। হাসপাতালগুলোকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক পলিসি ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রিন্সিপাল মানতে হবে। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে সংক্রামক ও অসংক্রামক অন্যান্য রোগের চেয়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে বেশি মানুষের মৃত্যু হবে। এমন তথ্য জানার পর দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ বা হাসপাতালগুলো নিরাপত্তার জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে তা দেখতে হবে। কারণ আমাদের অবহেলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা ছাড়া আর কোনো গতি আছে বলে মনে হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ জানান, বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রচলিত আছে, তার বেশিরভাগই এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যে হারে জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে, সে হারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হচ্ছে না। যে গতিতে পৃথিবী থেকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক নিঃশেষ হচ্ছে, তাতে অচিরেই চিকিৎসকদের সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে। রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু সংক্রমণের ভয়ে অতি ছোট সার্জারি করতেও চিকিৎসকেরা সাহস পাবেন না। বর্তমানে বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাচ্ছে, তা পুরনো বা প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের সংক্ষিপ্ত রাসায়নিক রূপান্তরমাত্র। এসব অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছে না বা পারবে না।
নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনীহা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পেছনে কারণও আছে। একটি অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু সে তুলনায় মুনাফা করা যায় না। কোম্পানিগুলোর মতে, মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে অল্প কয়েকদিনের জন্য। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগের ক্ষেত্রে যেমন রোগীকে আজীবন ওষুধ গ্রহণ করতে হয়, অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে তেমন হয় না। দ্বিতীয়ত, একটি অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হওয়ার পর অল্প কয়েক বছরে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেলে মুনাফা তো দূর, পুঁজিও ফেরত আসে না। উদ্ভাবনের পর অ্যান্টিবায়োটিকের অনুমোদন পেতেও অনেক ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনও পাওয়া যায় না। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে বিনিয়োগে আজকাল আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রোগী, জয়ী হচ্ছে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। এই অশনিসংকেত বারবার উচ্চারিত হলেও সবাই নির্বিকার। অথচ কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে হতে পারে করুণ পরিণতি।
বিনা প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি রোধে আসছে কঠোর অভিযান :
১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন এবং নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন না করার কারণে দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) একটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। এ কারণে বিনা প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি রোধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে অভিযান আরো জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো ডিসপেনসারি বা ফার্মেসি যাতে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি না করে, সে বিষয়েও আইন রয়েছে। বিষয়টি চলমান তদারকি ও মোবাইল কোর্ট কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে। কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নকল ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এবং বিনা প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।
