ইতিহাস গড়ল নতুন প্রজন্মের স্পেন
আর্জেন্টিনার হৃদয় ভেঙে বিশ্বজয়ের অদম্য উচ্ছ্বাস
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
এক মাস ১০ দিনের বিশ্বকাপ উৎসবের শেষ রাতে ফুটবল বিশ্ব দেখল এক নতুন সম্রাটের অভিষেক। কোটি কোটি সমর্থকের প্রত্যাশা, আবেগ আর উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বিশ্বকাপ ফাইনালে শিরোপা জিতল সেই দলই, যারা পুরো ম্যাচজুড়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে প্রতিটি মুহূর্তে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলের দেখা না মিললেও অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে বদলি ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলেই নির্ধারিত হয় ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরের ভাগ্য।
স্কোরলাইন মাত্র ১-০। কিন্তু এই একটি গোল পুরো ম্যাচের চিত্র প্রকাশ করে না। মাঠের খেলায় ছিল স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য। বল দখল, আক্রমণ, পাসের নিখুঁত সমন্বয়, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, সুযোগ সৃষ্টি কিংবা রক্ষণ- সব বিভাগেই আর্জেন্টিনাকে ছাড়িয়ে যায় লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। পরিসংখ্যানও সেই কথাই বলছে। প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে স্পেন। ২০টি শট নিয়েছে, যার ১২টিই ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা পুরো ১২০ মিনিটে মাত্র দুটি শট নিতে পেরেছে, অথচ একটিও ছিল না গোলমুখে। ১৯৬৬ সালে বিস্তারিত পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরুর পর বিশ্বকাপ ফাইনালে কোনো দল প্রথমবারের মতো লক্ষ্যে একটি শটও রাখতে পারেনি।
ফাইনালের আগে সব আলো ছিল লিওনেল মেসিকে ঘিরে। টুর্নামেন্টজুড়ে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনাকে প্রায় একাই ফাইনালে তুলেছিলেন এই কিংবদন্তি। অনেকেই আশা করেছিলেন, ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে আবারো হয়তো নিজের জাদুতে বদলে দেবেন ম্যাচের ভাগ্য। কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে সেই জাদু আর দেখা গেল না। স্পেনের পরিকল্পিত প্রেসিং, রদ্রির নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, কুবার্সি-লে নরমঁদের শক্ত রক্ষণ আর মাঝমাঠের নিরবচ্ছিন্ন চাপ মেসিকে প্রায় পুরো ম্যাচেই নিষ্ক্রিয় করে রাখে।
খেলার শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, স্পেন কোনো ঝুঁকি না নিয়ে নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে চায়। ছোট ছোট পাস, দ্রুত পজিশন পরিবর্তন, উইং ব্যবহার এবং প্রতিপক্ষের অর্ধে নিরন্তর চাপ—এই কৌশলেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় তারা। প্রথম পাঁচ মিনিটেই দুবার আর্জেন্টিনার রক্ষণে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেন লামিন ইয়ামাল ও দানি ওলমো। ইয়ামালের কোনাকুনি শট দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস। সেই সেভই যেন আর্জেন্টিনাকে শুরুতেই বড় ধাক্কা থেকে বাঁচিয়ে দেয়।
দুই মিনিট পর পাল্টা আক্রমণে প্রথমবারের মতো আলোচনায় আসেন লিওনেল মেসি। মাঝমাঠ থেকে বাড়ানো বল ধরে একাই এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। সামনে তখন শুধু গোলরক্ষক উনাই সিমোন। কিন্তু ডি-বক্সের অনেক বাইরে বেরিয়ে এসে নিখুঁত টাইমিংয়ে বল ক্লিয়ার করে দেন স্পেনের গোলরক্ষক। সেটিই ছিল ম্যাচে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মুহূর্তগুলোর একটি।
এরপর আবারো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় স্পেন। মাঝমাঠে রদ্রি ও পেদ্রির নিখুঁত পাসিংয়ে ছন্দ হারিয়ে ফেলে আর্জেন্টিনা। নিকো উইলিয়ামস ও ইয়ামাল দুই প্রান্ত দিয়ে একের পর এক আক্রমণ গড়ে তুলতে থাকেন। আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারদের প্রায় সব সময়ই নিজেদের বক্সের আশপাশে ব্যস্ত থাকতে হয়।
তবে এই সময়টায় আর্জেন্টিনাকে বাঁচিয়ে রাখেন একজনই- এমিলিয়ানো মার্তিনেস। বিশ্বকাপজয়ী এই গোলরক্ষক যেন একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মিকেল ওইয়ারসাবালের শট, দানি ওলমোর দূরপাল্লার প্রচেষ্টা, লামিন ইয়ামালের গতিময় আক্রমণ- সবকিছুর সামনে দৃঢ় প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান তিনি। একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে স্পেনকে হতাশ করেন।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট- রক্ষণ শক্ত রেখে সুযোগ পেলে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যাওয়া। কিন্তু স্পেনের উচ্চ প্রেসিং, দ্রুত বল পুনরুদ্ধার এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণের কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগই পায়নি লিওনেল স্কালোনির দল। মেসি মাঝেমধ্যে বল পেলেও তাকে ঘিরে ফেলেছেন দুই কিংবা তিনজন স্প্যানিশ ফুটবলার। আলভারেস, এনসো ফের্নান্দেস কিংবা দে পলও নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেননি।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে আবারো গোলের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে স্পেন। মিকেল ওইয়ারসাবাল ডি-বক্সের মুখ থেকে শট নিলেও সেটি সহজেই আটকে দেন মার্তিনেস। এরপর লিসান্দ্রো মার্তিনেসের একটি কঠিন ফাউলে ম্যাচে প্রথম হলুদ কার্ড ওঠে। উত্তেজনা বাড়লেও গোলের দেখা মেলেনি।
৪৫ মিনিট শেষে স্কোরবোর্ডে তখনো ০-০। কিন্তু মাঠের খেলা বলছিল অন্য গল্প। আর্জেন্টিনা কোনোভাবে সমতা ধরে রাখতে পেরেছে, আর স্পেন অপেক্ষা করছে সেই এক মুহূর্তের, যা বদলে দিতে পারে পুরো বিশ্বকাপের ইতিহাস।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই ম্যাচের চিত্র আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিরতির পর যেন নতুন উদ্যমে মাঠে নামে স্পেন। আর্জেন্টিনাকে নিজেদের অর্ধে আটকে রেখে একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। বল যেন বারবার আছড়ে পড়ছিল আকাশি-সাদা রক্ষণপ্রাচীরে। আর সেই প্রাচীরের শেষ প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেস।
৪৮তম মিনিটে অ্যালেক্স বায়েনার দূরপাল্লার শট সহজেই আটকে দেন মার্তিনেস। কয়েক মিনিট পর মাঝমাঠে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বদলি নেমে লেয়ান্দ্রো পারেদেস রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। রেফারি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান। সেই মুহূর্তে বোঝা যাচ্ছিল, চাপ সামলাতে গিয়ে ধৈর্য হারাতে শুরু করেছে আর্জেন্টিনা।
স্পেন অবশ্য নিজেদের পরিকল্পনা থেকে একচুলও সরে আসেনি। ধীরস্থিরভাবে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে তারা প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তুলছিল। ৬০ মিনিটের পর ম্যাচে বড় পরিবর্তন আনেন স্পেন কোচ। মাঠে নামানো হয় ফেরান তোরেস ও পেদ্রিকে। এই দুই বদলি খেলোয়াড়ই পরবর্তীতে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বদলি নেমেই আক্রমণে নতুন গতি আনেন ফেরান তোরেস। ৬৮তম মিনিটে লামিন ইয়ামালের নিখুঁত ক্রসে তার হেড জমে যায় এমিলিয়ানো মার্তিনেসের গ্লাভসে। দুই মিনিট পর আবারো বিপজ্জনক শট নেন পাউ কুবার্সি। অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটিও ফিরিয়ে দেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক। স্পেনের আক্রমণ যত বাড়ছিল, মার্তিনেসও যেন ততই দুর্ভেদ্য হয়ে উঠছিলেন।
অন্যদিকে, লিওনেল স্কালোনি একের পর এক পরিবর্তন আনলেও আর্জেন্টিনার খেলায় কোনো প্রাণ ফেরেনি। রদ্রিগো দে পল, ক্রিস্তিয়ান রোমেরোদের তুলে নতুন মুখ নামানো হলেও মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি দলটি। মেসি বারবার নিচে নেমে বল সংগ্রহের চেষ্টা করলেও স্পেনের প্রেসিং তাকে কোনো জায়গাই দিচ্ছিল না। জুলিয়ান আলভারেস ছিলেন বিচ্ছিন্ন, এনসো ফের্নান্দেস ও ম্যাক অ্যালিস্টারও নিজেদের ছন্দ হারিয়ে ফেলেন।
সময়ের কাঁটা যত ৯০ মিনিটের দিকে এগোচ্ছিল, স্পেনের আক্রমণও তত ভয়ংকর হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, গোল কেবল সময়ের অপেক্ষা। অথচ আর্জেন্টিনা তখনো পুরো ম্যাচে লক্ষ্যে একটি শটও নিতে পারেনি। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এমন অসহায় ফুটবল অনেক দিন দেখা যায়নি।
ম্যাচের নির্ধারিত সময়ের যোগ করা মুহূর্তেই আসে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। মাঝমাঠে পাউ কুবার্সিকে থামাতে গিয়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এনসো ফের্নান্দেস। সঙ্গে সঙ্গেই লাল কার্ড বের করেন রেফারি। ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। ফাইনালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ও ঘুরে যায় ঠিক সেখানেই।
সংখ্যাগত সুবিধা পেয়েই স্পেন যেন আরো হিংস্র হয়ে ওঠে। যোগ করা সময়ের ৯৩তম মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের দুর্দান্ত হেড প্রায় জালে ঢুকেই যাচ্ছিল। কিন্তু আবারো অসাধারণ প্রতিক্রিয়ায় আর্জেন্টিনাকে বাঁচান মার্তিনেস। মুহূর্ত পর লামিন ইয়ামালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক পোস্টের কোণ ঘেঁষে জালে জড়াতে যাচ্ছিল। সেদিন যেন নিজের জীবনের সেরা ম্যাচটাই খেলছিলেন আর্জেন্টিনার এই গোলরক্ষক।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হলেও ম্যাচের গতি একটুও কমেনি। অতিরিক্ত সময়েও আক্রমণের ধার বজায় রাখে স্পেন। আর আর্জেন্টিনা তখন পুরোপুরি নিজেদের বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু প্রতিরোধ গড়ে তুলছিল। মেসিদের চোখেমুখে তখন ক্লান্তি, স্প্যানিশদের চোখে শুধুই শিরোপা জয়ের ক্ষুধা।
অবশেষে আসে সেই কাক্সিক্ষত মুহূর্ত। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিট। ডান প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্তভাবে উঠে আসেন পেদ্রো পোরো। নিখুঁত একটি ক্রস ভাসিয়ে দেন দূরের পোস্টের দিকে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন নিকো উইলিয়ামস। আকাশে ভেসে উঠে হেডে বল নামিয়ে দেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যেই বল পৌঁছে যায় ফেরান তোরেসের সামনে। এক সেকেন্ডও দেরি করেননি স্পেনের এই ফরোয়ার্ড। ডান পায়ের দুর্দান্ত ভলিতে বল পাঠিয়ে দেন জালের ভেতর।
মার্তিনেস এবারো ঝাঁপিয়েছিলেন। কিন্তু এতক্ষণ যিনি একাই আর্জেন্টিনাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিও আর প্রতিরোধ গড়তে পারলেন না। ১০৬ মিনিটের সেই এক মুহূর্তেই বদলে গেল বিশ্বকাপের ইতিহাস।
গোলের পর বিস্ফোরিত হয় মেটলাইফ স্টেডিয়াম। লাল-হলুদ জার্সিধারী সমর্থকদের উল্লাসে কেঁপে ওঠে গ্যালারি। স্পেনের বেঞ্চ থেকে ছুটে আসেন খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ। অন্যদিকে আর্জেন্টাইন শিবিরে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। মেসি দুই হাত কোমরে রেখে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন মাঠের দিকে। যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, এতদিনের স্বপ্ন এভাবে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
গোল হজমের পর মরিয়া হয়ে সামনে ওঠে আর্জেন্টিনা। কিন্তু পুরো ম্যাচের মতো শেষ সময়েও তারা ছিল দিশাহীন। কয়েকটি কর্নার পেলেও স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ সহজেই সব বিপদ সামাল দেয়। শেষ সুযোগে জুলিয়ানো সিমেওনে ফাঁকা জায়গায় বল পেয়েও শট উড়িয়ে মারলে আর্জেন্টিনার শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় স্পেনের উল্লাস। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন, কেউ দুই হাত আকাশের দিকে তুলে চিৎকার করলেন। আর আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের মুখজুড়ে শুধু হতাশা। ম্যাচ শেষে উত্তেজনার রেশে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে লেয়ান্দ্রো পারেদেসও লাল কার্ড দেখেন। ততক্ষণে অবশ্য সব শেষ। বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি তখন স্পেনের হাতে ওঠার অপেক্ষায়।
ফাইনালের স্কোরলাইন ছিল মাত্র ১-০। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, মাঠের লড়াই ছিল অনেকটাই একপেশে। পুরো ম্যাচে প্রায় ৬৫.১ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেছিল স্পেন। তারা ২০টি শট নেয়, যার ১২টিই ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে আর্জেন্টিনা নিতে পেরেছে মাত্র দুটি শট, যার একটিও ছিল না লক্ষ্যে। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এটি বিরল এক ঘটনা। ১৯৬৬ সালে বিস্তারিত পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম কোনো দল ফাইনালে গোলমুখে একটি শটও রাখতে পারেনি। আর সেই দলটির নাম আর্জেন্টিনা- টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আলোচিত এবং অন্যতম সফল দল।
স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমোনকে পুরো ম্যাচে একটি সেভও করতে হয়নি। অন্যদিকে এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে করতে হয়েছে ১১টি সেভ। পরিসংখ্যানের এই পার্থক্যই বলে দেয়, ফাইনালে কোন দল আক্রমণ করেছে আর কোন দল কেবল টিকে থাকার লড়াই করেছে।
তবে সংখ্যার হিসাবের বাইরেও স্পেনের জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের কৌশলগত শৃঙ্খলা। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে শুরু থেকেই বুঝেছিলেন, আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র লিওনেল মেসি। তাই মেসিকে আলাদা করে মার্কিং না করে তার চারপাশের জায়গাগুলো বন্ধ করে দেন তিনি। রদ্রি মাঝমাঠে প্রতিটি আক্রমণের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেছেন, পেদ্রি ও দানি ওলমো বলের গতি বাড়িয়েছেন, আর দুই উইংয়ে লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করেছেন। ফলে মেসি বল পেলেও সামনে খালি জায়গা পাননি। তার প্রতিটি পাস, প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি সিদ্ধান্তের সামনে ছিল স্প্যানিশ ফুটবলারদের সংগঠিত চাপ।
আর্জেন্টিনা পুরো টুর্নামেন্টে ছিল আক্রমণাত্মক, আত্মবিশ্বাসী এবং কার্যকর। ফাইনালের আগে তারা ১৯টি গোল করেছিল। মেসি একাই করেছিলেন ৮ গোল, সঙ্গে ৪টি অ্যাসিস্ট। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি দলটি। জুলিয়ান আলভারেস, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো দে পল কিংবা এনসো ফের্নান্দেস- কেউই নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেননি। স্পেনের উচ্চ প্রেসিং এবং দ্রুত বল পুনরুদ্ধারের কৌশলের সামনে তারা যেন অসহায় হয়ে পড়েছিলেন।
ফাইনালের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন অবশ্য লিওনেল মেসি। পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলা এই কিংবদন্তি ফুটবলারের সামনে ছিল ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় লেখার সুযোগ। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নও দেখেছিলেন তিনি। পুরো আসরে নিজের বয়সকে হার মানিয়ে যে ফুটবল খেলেছেন, তা ছিল বিস্ময়কর। চল্লিশের কাছাকাছি বয়সে আট গোল, চার অ্যাসিস্ট এবং অসংখ্য গোলের সুযোগ তৈরি- এসবই তার অসাধারণ সামর্থ্যরে প্রমাণ। কিন্তু ফাইনালের রাতে স্পেনের সংগঠিত ফুটবলের সামনে সেই জাদুর ছোঁয়া আর দেখা যায়নি।
শেষ বাঁশি বাজার পর মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে বসে থাকা মেসির ছবি হয়তো এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে থাকবে। মুখে গভীর হতাশা, চোখে অপূর্ণতার ছাপ। কয়েক বছর আগে কাতারে যে মানুষটি বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে ফুটবল জীবনের পূর্ণতা পেয়েছিলেন, এবার সেই মানুষকেই দেখা গেল নীরবে পরাজয় মেনে নিতে। তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেবেন কিনা, সে সিদ্ধান্ত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানাননি। তবে ফুটবলবিশ্বের অনেকেই মনে করছেন, এটাই হয়তো বিশ্বকাপ মঞ্চে মেসির শেষ উপস্থিতি। যদি তাই হয়, তবে তার বিশ্বকাপ অধ্যায়ের শেষ পাতাটি লেখা হলো এক বেদনাময় পরাজয়ের গল্প দিয়ে। তবে একটি ম্যাচ কিংবা একটি হার কোনোভাবেই তার কিংবদন্তি মর্যাদাকে ম্লান করতে পারে না। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে তিনি থাকবেন সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসেবেই।
অন্যদিকে, স্পেনের জন্য এটি শুধু একটি শিরোপা জয় নয়; এটি একটি নতুন যুগের ঘোষণা। ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে তারা প্রমাণ করল, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সাফল্য ছিল না কোনো আকস্মিক ঘটনা। লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি, রদ্রি, পাউ কুবার্সি, উনাই সিমোন ও ফেরান তোরেসদের নিয়ে গড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম ইতোমধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে পরিপূর্ণ দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তরুণদের গতি, অভিজ্ঞদের স্থিরতা এবং কোচের কৌশল- এই তিনের সমন্বয়েই বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি আবার ফিরল মাদ্রিদে।
পুরো টুর্নামেন্টেও স্পেন ছিল ধারাবাহিক। রক্ষণে ছিল অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ আর আক্রমণে ছিল বৈচিত্র্য। পুরো বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল হজম করে শিরোপা জয়ের কীর্তি তাদের সাফল্যকে আরো অনন্য করে তুলেছে। ফাইনালেও তারা দেখিয়েছে, শুধু প্রতিভা নয়- শৃঙ্খলা, ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই বড় ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়।
এক মাস ১০ দিনের বিশ্বকাপ শেষ হলো এমন এক ফাইনাল দিয়ে, যেখানে স্কোরলাইন ছোট হলেও ইতিহাসের পরিসর বিশাল। একদিকে বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে গেল আর্জেন্টিনার। অপূর্ণ রয়ে গেল মেসির আরেকটি বিশ্বমুকুট জয়ের আশা। অন্যদিকে, স্পেন আবারো বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সিংহাসনে বসে জানিয়ে দিল- তাদের সোনালি অধ্যায় শেষ হয়নি, বরং শুরু হয়েছে নতুন এক রাজত্বের।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে উড়তে থাকে লাল-হলুদ কনফেটি। বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি যখন স্পেন অধিনায়কের হাতে উঠে গেল, তখন ফুটবল বিশ্ব যেন এক নতুন বাস্তবতাকে স্বাগত জানাল। বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের শেষ বাক্যটি লেখা হলো এভাবেই- স্পেন শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়নি, তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব মাঠেই প্রমাণ করেছে।
