কেন পারমাণবিক কৌশল সাজাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ‘টার্গেট’ কি চীন-রাশিয়া?
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধে জয়ী হতে সর্বস্ব দিয়ে লড়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন-তেহরান উভয়পক্ষই। তবে বড় ধরনের হামলা চালিয়েও কাক্সিক্ষত বিজয় বা যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে এক কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশও ক্ষিপ্ত। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে এখন কৌশলগত বিকল্প অত্যন্ত সীমিত।
অপরদিকে প্রচলিত সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে হাতিয়ার করেছে ইরান। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং সাশ্রয়ী ড্রোন-মিসাইল ব্যবহারের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারকে ঝুঁকিতে ফেলেছে দেশটি। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মার্কিন নির্ভরতা এবং ইরানের পাল্টা আঘাতের ভীতির কারণে এক ধরনের কৌশলগত পক্ষাঘাত বা জিম্মিদশার মধ্যে রয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য।
ইতোমধ্যে এই চলমান সংকট পারস্য উপসাগর ছাড়িয়ে বহুমুখী সংঘাতে রূপ নিয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সৌদি আরব, ইরাক, ইয়েমেন এবং জর্ডানের মতো অঞ্চলগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং অন্যদিকে ইরান ও তার মিত্ররা রয়েছে। এই পক্ষগুলো সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে।
অন্যদিকে ইরান, চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের জন্য একটি বড় ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ওয়াশিংটন আশঙ্কা করছে, এই তিন দেশের মিত্রতা মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে বৈশ্বিক রাজনীতিতে মার্কিন প্রভাব দুর্বল করে দিতে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর দেয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় সহজে এড়িয়ে চলতে পারছে ইরান। যদিও বেইজিং ও মস্কো সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেদের ঘাড়ে বড় ঝুঁকি নিতে চায় না। তারা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই অক্ষকে টিকিয়ে রেখেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে সবসময় কৌশলগত চাপে রাখে।
এমন আবহে পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে একটি বিশেষ
কৌশল সাজাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর (পেন্টাগন)। এর লক্ষ্য রাশিয়া কিংবা চীনের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুব সহজে যাতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। নতুন এই কৌশলটি গোপনীয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের প্রচলিত পারমাণবিক অস্ত্র নীতির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে।
কৌশলটি তদারকি করছেন পেন্টাগনের নীতিবিষয়ক প্রধান এলব্রিজ কলবি। সম্ভাব্য কোনো আঞ্চলিক সংঘাতে রাশিয়া বা চীন মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা চালালে, সে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই এই কৌশলের লক্ষ্য। এটি এমন এক সময়ে নতুন করে সাজানো হচ্ছে, যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন ‘একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।’ প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাসযোগ্য পারমাণবিক বিকল্প প্রয়োজন।’
কৌশলটি সম্পর্কে অবগত সূত্রের বরাত দিয়ে গত বুধবার এমন তথ্য জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত কৌশলে দূরপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ভরতার বদলে স্বল্পপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্রকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে।
মূলত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার সীমিত রাখা নিয়ে এতদিন রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘নিউ স্টার্ট’ নামে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছিল। প্রায় ছয় মাস আগে সেটির মেয়াদ শেষ হয়। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মস্কো বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি ওয়ারহেডের সংখ্যা না বাড়ায়, তাহলে তারাও উত্তেজনা বৃদ্ধির মতো কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তবে নতুন করে পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওই বিশেষ কৌশলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নতুন একটি পথ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে ইরান ও ওমান। তবে এই আলোচনায় যুক্ত ছিল না ওয়াশিংটন। গত বুধবার এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, হরমুজে দুই দেশ (ইরান-ওমান) যে পথ অনুসরণ করবে, তা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। তৃতীয় কোনো পক্ষ বাধা না দিলে শিগগিরই এ নিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করবে ইরান-ওমান। সেখানে রাজি হওয়া প্রধান বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। বর্তমানে বিবৃতিটির খসড়ার চূড়ান্ত পর্যালোচনা চলছে।’
ওমানের সঙ্গে সমঝোতা হলেও হরমুজ জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ হবে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসমাইল বাঘাই। তিনি মনে করেন, হরমুজ প্রণালিকে এখনো অনিরাপদ করে রাখার যেসব কারণ রয়েছে, সেগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধ এবং অন্যান্য আগ্রাসী ও হুমকিমূলক পদক্ষেপ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, হরমুজ নিয়ে তেহরান একটি চুক্তি করতে আগ্রহী। আর তা না হলে ইরানে ব্যাপক হামলা চালানোর হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। এরই মধ্যে ওমানের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি জানাল তেহরান।
এমন পরিস্থিতিতে হরমুজ ইস্যুতে বৃহস্পতিবার আল-জাজিরা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপ না করার আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের কাছে চিঠি দিয়েছে বিশ্বের শীর্ষ আটটি শিপিং সংস্থা। সেগুলো হলো- এশিয়ান শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিল, ক্রুজ লাইনস ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন, ইউরোপিয়ান শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিং, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ড্রাই কার্গো শিপওনার্স, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট ট্যাংকার ওনার্স এবং ওয়ার্ল্ড শিপিং কাউন্সিল। সোমবার জাতিসংঘে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়েছে জাহাজের মালিক ও পরিচালনাকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থাগুলো। বুধবার তা প্রকাশ্যে আসে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজকে লেখা এক চিঠিতে সংস্থাগুলো বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের জন্য কর্তৃপক্ষকে জাহাজ থেকে অর্থ আদায়ের অনুমতি দেয়া হলে তা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির লঙ্ঘন করবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি করবে। বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রভাবের বাইরেও এটি একটি ব্যতিক্রমী নজির স্থাপন করবে। এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক নৌচলাচল ও ট্রানজিট পথ হিসেবে ব্যবহৃত প্রণালিগুলোকে নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনি কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে।
সংস্থাগুলো বলেছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নৌচলাচলের অধিকারকে ‘ক্ষুণ্ন করা বা বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।’ একটি স্থায়ী টোল ব্যবস্থা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণ হতে পারে। চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রভাবের মানবিক মূল্যও দিতে হবে, যা বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন-জীবিকাকে প্রভাবিত করবে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক শাসনের ভিত্তি হিসেবে নৌচলাচলের স্বাধীনতা সংরক্ষণে আমাদের সমর্থন অব্যাহত রাখা অত্যাবশ্যক।
অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল একতরফা সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তুরস্কের রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর এজেন্সির প্রতিবেদনে এমনটি জানানো হয়েছে। স্থানীয় সময় গত বুধাবর নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা আজ ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের কমান্ডার আহমেদ ওয়াহিদিকে ঘোষণা করতে শুনেছি যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন অব্যাহত রাখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র লাভ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে আমি সংকল্পবদ্ধ।’
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ইসরায়েলের সর্বশ্রেষ্ঠ মিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ‘যা কিছু প্রয়োজন তা করতে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’
এছাড়া লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী ও হিজবুল্লাহর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ইসরায়েলের দুই সেনা নিহত হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন আল-জাজিরা। এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত বুধবার লেবাননের মাজদাল জৌন শহরে তাদের দুই রিজার্ভ সেনা নিহত হয়েছেন। ওই দুই সেনা সম্মুখযুদ্ধে নিহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে আরো চার সেনা গুরুতর আহত হন। তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আরো জানিয়েছে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে তারা। এতে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবানন একটি বড় অমীমাংসিত ইস্যু। ইরান দাবি করে আসছে- তাদের (যুক্তরাষ্ট্র-ইরান) সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরিধি লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত। অন্যদিকে ইসরায়েল জানায়, এই চুক্তির মধ্যে লেবানন বা হিজবুল্লাহর সঙ্গে চলমান সংঘাত অন্তর্ভুক্ত নয়। যদিও হরমুজকে কেন্দ্র করে বর্তমানে যুদ্ধবিরতি ব্যাহত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে। এই যুদ্ধ এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের নয়, এটি একটি বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। সময় যত এগোচ্ছে, এই যুদ্ধের বিস্তৃতি বাড়ছে। নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। যা বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা বলে মনে করছেন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
