×

প্রথম পাতা

কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না ঘাতক হামের প্রকোপ

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে  না ঘাতক হামের প্রকোপ

ছবি: সংগৃহীত

হামে আক্রান্ত হয়ে সন্তানের মৃত্যু, বাবা-মায়ের বুকফাটা আর্তনাদের চিত্র যেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের সাধারণ দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। গত শনিবার দুপুরে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে আইসিইউ না পেয়ে মারা গেছে ৮ মাস বয়সী আয়ান। শিশুটির বাবা মোরশেদ আলম ও মা খোরশেদা বেগমের দাবি, শুক্রবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে আয়ানকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে আইসিইউ না পাওয়ায় পরে তাকে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে নিয়ে আসেন তারা। শিশুটির আইসিইউ প্রয়োজন হলেও বেড দেয়া হয়নি। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর আয়ানের মৃত্যু হয়।

হামের সংক্রমণে সন্তান হারানোর শোক যেমন আছে তেমনি আছে নিঃস্ব হওয়ার ঘটনাও। সম্প্রতি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)-এর যৌথ জরিপের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে হামের চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খরচ বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার ঋণে জড়িয়ে পড়ছে। হামে আক্রান্ত প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টি (প্রায় ৮৯ শতাংশ) চিকিৎসার খরচ মেটাতে ঋণ নিয়েছে। এছাড়া প্রতি ১০টি পরিবারের ৬টি (প্রায় ৬১ শতাংশ) নিজেদের সঞ্চয় ফুরিয়েছেন। ৪ শতাংশ পরিবার নিজেদের সম্পদ বিক্রি করেছেন এবং প্রায় ৩ শতাংশ অনুদান থেকে ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করেছেন।

মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়া অতি সংক্রামক এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকাও। কিছুতেই যেন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না প্রাণঘাতী হামের প্রাদুর্ভাব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রোগটি

নিয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ শুরু করে। সরকারি হিসাবই বলছে, সাড়ে চার মাসে অতি সংক্রামক এই ভাইরাসে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৮৭৩ জন শিশু। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে ৭৭৫ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৮ জন মারা গেছে। এই সময়ে হামের উপসর্গে দেখা গেছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩২০ জনের মধ্যে। আর মোট ১৭ হাজার ১১৫ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম শনাক্ত হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এপ্রিল থেকে শুরু হয় বিস্তৃত টিকা কার্যক্রম। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক জোট গেøাবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভ (গ্যাভি) সমর্থিত আন্তর্জাতিক পর্যালোচনা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর দিক থেকে শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হামের সংক্রমণ প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে হার্ড ইমিউনিটি অত্যাবশ্যকীয় একটি ব্যবস্থা। একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে যদি নির্দিষ্ট অনুপাতে টিকা দেয়া যায়, তাহলে ওই কমিউনিটিতে সেই নির্দিষ্ট রোগের আর সংক্রমণ হয় না। এ ব্যবস্থাই হার্ড ইমিউনিটি নামে পরিচিত। তারা বলছেন, এক সময় দেশে হামের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ। কিন্তু গত দুই থেকে ৩ বছরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে এ বছর সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়েছে এবং অনেক শিশু সুরক্ষার বাইরে থেকে গেছে।

এদিকে টিকা নিয়েও অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে এমন নজিরও আছে। টিকা সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা- এ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। তবে হামের টিকা অকার্যকর হয়ে পড়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। গত ৪ আগস্ট সংস্থাটি দাবি করে, বর্তমান টিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো অত্যন্ত কার্যকর এবং সুরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করছে। আইসিডিডিআরবি এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) যৌথভাবে করা এই গবেষণায় দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি মূলত ‘বি৩’ উপশাখার অন্তর্ভুক্ত, যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া হামের উপাদানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ভাইরাসের কোষে প্রবেশের প্রধান মাধ্যম ‘এইচ প্রোটিন’-এ ৪টি মিউটেশন বা পরিবর্তন শনাক্ত হলেও হামের ভাইরাস এখনো একটি মাত্র ‘সেরোটাইপ’ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। ফলে টিকার মাধ্যমে মানবদেহে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি খুব সহজেই ভাইরাসটির বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ করতে সক্ষম। পূর্ণ ২ ডোজ টিকা নেয়ার পরও কিছু শিশুর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ব্যক্তিভেদে অ্যান্টিবডি তৈরিতে তফাত, সময়ের সঙ্গে প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা অপুষ্টির মতো বিষয়গুলোকে ধারণা করা হচ্ছে বলেও গবেষণায় দেখানো হয়েছে।

আইসিডিডিআরবির সিনিয়র পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান ও নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ জানান, টিকাদানের হার ভালো হওয়া সত্ত্বেও কেন এই প্রাদুর্ভাব এত বড় হলো এবং নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে ৪ বিভাগীয় হাসপাতালে বিস্তৃত কোহর্ট ও কমিউনিটিভিত্তিক গবেষণা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, কোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্যে কান দিয়ে শিশুদের টিকাদান বিলম্বিত বা বাতিল করা যাবে না। প্রতিটি শিশুর বয়স অনুযায়ী হাম-রুবেলা টিকার সবকটি ডোজ নিশ্চিত করাই এই রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে সরকার বিশেষ টিকা কার্যক্রম চালালেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রার বাইরে থেকে গেছে ৪৬ লাখ শিশু। সংখ্যাটি মোটেও কম নয়। এই বিপুল সংখ্যক শিশুকে টিকার বাইরে রেখে হামের মতো অতি ছোঁয়াচে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এখন তেমনটাই হয়েছে।

প্রকোপ কবে নাগাদ কমবে এমন প্রশ্নের উত্তরে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন মনে হচ্ছে নিয়তির হাতেই সব সঁপে দিয়েছি। ধীরে ধীরে শিশুরা আক্রান্ত হতে হতে যখন আর কোনো শিশু আক্রান্ত হবার বাকি থাকবে না, তখন এই রোগের সংক্রমণ কমবে। কেননা, সংক্রমণ না কমলেও বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন আর হচ্ছে না। স¤প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে টিকাদান চলছে। সেই কর্মসূচির অধীনে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেয়া হয়। আমরা দেখছি ৫/৬ মাসের শিশুও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। ৬ থেকে ৭ বছর বয়সী বিরাট সংখ্যক শিশু এর মধ্যে হামের টিকা পাচ্ছে না। সুতরাং তাদের হাম হতেই থাকবে। যদি অন্য কোনো ব্যবস্থা না নেয়া হয়, যেমন বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি, কিংবা শিশুদের টিকার বয়স আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে যেমন- বিশেষ ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সীদের টিকার আওতায় আনা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ৮ থেকে ৯ বছর বয়স করা যেতে পারতো। যদি সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা যেত, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত। এখন ধীরে ধীরে সব শিশু আক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখা যাচ্ছে না।

ইপিআই’র সাবেক প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী ভোরের কাগজকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী টিকাদানের ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসার কথা। কিন্তু ঠিক কী পরিমাণ শিশুকে টিকা দিতে হবে, তার সঠিক তথ্য না নিয়ে ক্যাম্পেইন শুরু করায় ৪ মাসেও সংক্রমণ কমছে না। এখনো শত শত শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক শিশুর প্রাণহানি ঘটছে। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়ে গেছে।

এদিকে দেশের হাম পরিস্থিতির সার্বিক বিষয়ে গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার নিজাম উদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হামের টিকাদান কৌশল নতুন করে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। সা¤প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হামে মৃত্যুর ৯৫ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু, ৫৬ শতাংশ ৯ মাসের কম এবং ২২ শতাংশ ৬ মাসেরও কম বয়সী। একই সঙ্গে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুরাও এখন আক্রান্ত হচ্ছে। তাই শুধু বয়সের গতানুগতিক ছকে আটকে না থেকে আক্রান্তদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে টিকাদানের নতুন লক্ষ্যগোষ্ঠী নির্ধারণ করতে হবে। জিরো-ডোজ শিশুদের দ্রুত চিহ্নিত করা এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলা ও উপজেলাগুলোতে শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। টিকা দেয়ার বয়সসীমা বাড়ানো হলে সে অনুযায়ী পর্যাপ্ত টিকার মজুত ও আগাম কৌশল তৈরি করা জরুরি। পুরো প্রক্রিয়ায় শুধু সরকারের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

গত ২৯ জুলাই এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, বর্তমানে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৯৯ শতাংশই কখনো হামের টিকা নেয়নি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুতই আরো ১ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেয়া হবে। আর ১ আগস্ট ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অপুষ্টির কারণে অনেক শিশু হামের সংক্রমণের ঝুঁকিতে বেশি রয়েছে। মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করা গেলে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা আরো শক্তিশালী হবে। সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সৌদিতে কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত ১৬ বাংলাদেশি

সৌদিতে কারখানায় ভয়াবহ আগুন, নিহত ১৬ বাংলাদেশি

এসএসসিতে ৩১২ প্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল

এসএসসিতে ৩১২ প্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল

ভিন্ন উপায়ে জানুন পূর্ণাঙ্গ এসএসসির ফলাফল

ভিন্ন উপায়ে জানুন পূর্ণাঙ্গ এসএসসির ফলাফল

এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেল ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন  শিক্ষার্থী

এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেল ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App