×

প্রথম পাতা

গ্যাস-বিদ্যুতে নাকানিচুবানি

Icon

দেব দুলাল মিত্র

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাস-বিদ্যুতে নাকানিচুবানি

ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। অব্যাহতভাবে চলতে থাকা এই ভোগান্তির সঙ্গে বাড়ছে ক্ষোভ। বছরের পর বছর ধরে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে লোডশেডিং সাধারণ মানুষ মেনে নিলেও পরিস্থিতি এখন চরম বিপর্যয়কর পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিদ্যুতে লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেও এই দুই সমস্যা সমাধানের নিশ্চয়তা দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নাই। টার্মিনাল মেরামত না হলে আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না। যে গ্যাস আছে সেটাও জাতীয় গ্রিডে দেয়া সম্ভব হবে না। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, এই মুহূর্তের সংকট মোকাবিলার জন্য এলএনজি আমদানি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানিও অব্যাহত রাখতে হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বাধিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারলে বিদ্যুতের সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে। জনগণের ভোগান্তি কমবে। সবাই সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতার করা বললেও এই খাতটিতে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, সংকটের জন্য সরকারের অতিরিক্ত সামাজিক প্রতিশ্রæতি, সঠিক মূল্যনীতির অভাব ও সিস্টেম লস দায়ী। সংকট সমাধানের চেষ্টা না করে বছরের পর বছর তা জমিয়ে রেখে আজ এ পর্যায়ে আনা হয়েছে। কেবল সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা না করে চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও জোর দিতে হবে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের প্রভাব সমন্ধে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, সংকটের ফলে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে কারখানাগুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। দ্রুত সমাধান না আসলে গার্মেন্ট খাতের বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। কারখানাগুলোতে গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। উচ্চহারে বিল দিয়েও সময়মতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাঁচাতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া এবং জরুরি সুরক্ষা বা ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দেয়ার জন্য আমি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

পিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানিয়েছেন, বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়েছে। গত বছর এই সময় ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল। এই বছর একই সময় চাহিদা বেড়ে ১৮ থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুতেরও সংকট হচ্ছে। কয়লা সংকটের কারণে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাস চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একই অবস্থা। আবার আমদানিকৃত বিদ্যুতের পরিমাণও কমেছে।

জানা গেছে, বিগত সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতি ১ থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মধ্যেই ছিল। গত কয়েক মাসে ঘাটতি ক্রমেই বাড়তে থাকে। এই ঘাটতি এখন ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ঘাটতি আরো বাড়বে। এই সঙ্গে বাড়বে লোডশেডিং। লোডশেডিংয়ের কারণে শহর ও গ্রামের সব শ্রেণির মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও কর্মীদের অবরোধের ঘটনার পর দেশের ৮০টি পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি তাদের অফিস, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইজিপি’র কাছে চিঠি দিয়েছে। বিদ্যুতের অভাবে দেশের কোল্ড স্টোরেজগুলো সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নষ্ট হচ্ছে সংরক্ষিত কাঁচামাল। বিদ্যুতের অভাবে বড় শহরগুলোর বাইরে অবস্থান করা বিশাল জনগোষ্ঠী চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে। বিদ্যুতের অভাবে বরফ উৎপাদন কমে যাওয়ায় মৎস্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। বরফের অভাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালি, ভোলা, বরিশাল, নোয়াখালির জেলেরা মাছ ধরতে যেতে পারছেন না।

ওদিকে গ্যাসের উৎপাদন অব্যাহতভাবে কমে যাওয়ায় পাশাপাশি দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট। গ্যাস সংকট বাড়ার পর তা কমে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে নেমেছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রতিদিন ২২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে স্বাভাবিক সময়ে ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এখন এই ঘাটতি আরো বেড়েছে। জ¦ালানির অভাবে গাড়ির চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ১০০ টাকার গ্যাস নিতে পারছে। রাজধানীর বেশির ভাগ সিএনজি স্টেশন বন্ধ হয়ে আছে। কিছু পাম্প খোলা থাকলেও গ্যাসের চাপ না থাকায় পর্যাপ্ত গ্যাস দিতে পারছে না। তারপরও গ্যাসের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। তিতাসের আওতাভুক্ত এলাকার বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাসের চুলায় রান্না প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সর্বোচ্চ ২০ থেকে ১০০ টাকার গ্যাস পাচ্ছে গাড়ির চালকরা। গ্যাস সংকটে এখনো বন্ধ হয়ে আছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বেশ কিছু সিএনজি স্টেশন। আবার কোনো কোনো পাম্পে রয়েছে গ্যাসের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। খোলা থাকা পাম্পগুলোতে গ্যাসের প্রেশার না থাকায় পর্যাপ্ত গ্যাস দিতে পারছে না।

অপরদিকে গত কয়েক দিনে লোডশেডিংয়ের ঢেউ ঢাকা শহরেও লেগেছে। রাজধানীর সব এলাকাতেই ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে পল্লি এলাকার মানুষ। বিদ্যুৎ না পাওয়ায় পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটেছে। উত্তরবঙ্গে বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে কলকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে ক্ষুব্ধ

গ্রাহকেরা পল্লি বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর করেছে। রংপুরের গ্রামাঞ্চলে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। গোপালগঞ্জে ১৭/১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। অন্যান্য অনেক জেলায় ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকা এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। দেশে প্রায় পাঁচ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় চার কোটি হচ্ছে পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির আওতায়। প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাহককে পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশ পল্লি এলাকায় সরবরাহ করা হয়। গত বেশ কয়েক দিন ধরে সমিতিগুলোর গড় চাহিদা ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াটের বিপরীতে পাচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে উদ্যোগ কাজে আসছে না। বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি সাশ্রয়ের কিছু উদ্যোগ নেয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই সব উদ্যোগ ভেস্তে যায়। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য রাত ৮টার মধ্যে মার্কেট বন্ধ করা, আলোকসজ্জা না করা, বিলবোর্ড বন্ধ রাখা, সরকারি দপ্তরগুলোতে এসি, ফ্যান, লাইট ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু কেউ এই নির্দেশনার তোয়াক্কা করেনি। সরকারের মনিটরিংয়ের অভাবেই তা ভেস্তে যায়। এই অবস্থায় গত বুধবার থেকে আবারো নতুন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কতটা বাস্তবায়ন হবে তা দেখার বিষয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

১৫ আগস্ট উপলক্ষে বিএনপির কর্মসূচি ঘোষণা

১৫ আগস্ট উপলক্ষে বিএনপির কর্মসূচি ঘোষণা

‘ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়’

‘ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়’

‘হাসিনাকে ফেরত না দিলে ভারত সফরে যাবেন না তারেক রহমান’

‘হাসিনাকে ফেরত না দিলে ভারত সফরে যাবেন না তারেক রহমান’

জুমার নামাজে এক রাকাত ছুটে গেলে কী করণীয়

জুমার নামাজে এক রাকাত ছুটে গেলে কী করণীয়

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App