ঢাকার সড়কে নৈরাজ্য, দেখার যেন কেউ নেই
দেব দুলাল মিত্র
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মূল সড়কে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা দেখার কেউ নেই। সব সড়কেই বিশৃঙ্খল অবস্থায় যানবাহন চলাচল করছে। কমেনি চালকদের বেপরোয়া আচরণ। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামাও বন্ধ হয়নি। তবে এআই ক্যামেরা বসানোর পর ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরেছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, বাসস্ট্যান্ডগুলোতে বিশৃঙ্খলার প্রধান দায় গণপরিবহনের। সব বাসস্ট্যান্ডেই গনপরিবহনগুলো পাশাপাশি অবস্থান নিয়ে মূল সড়কের প্রায় ৭৫ শতাংশ জায়গা দখল করে রাখে। এরফলে সেখানে যানজটের সৃষ্টি হয়। পেছনের কোনো যানবাহন সামনে যেতে পারে না। এই গণপরিবহনগুলোর সব সময় পাশাপাশি সিগন্যাল অমান্য করার প্রবনতাও রয়েছে। গ্রীন সিগন্যাল চালু হওয়ার পরও বাসগুলো যাত্রী ওঠানামা করানোর ফলে পেছনের গাড়িগুলো আটকে থাকে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, অধিকাংশ চালকই সড়কে চলাচলের মৌলিক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না। ফলে সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। বাস মালিকদেরও দায় রয়েছে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে ট্রিপভিত্তিক বেতন ব্যবস্থা চালু থাকায় চালকেরা বেশি যাত্রী তুলতে এবং দ্রুত ট্রিপ শেষ করতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এ জন্য বিআরটিএও অনেকাংশে দায়ী। ফিটনেস সনদ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের পদ্ধতিতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। এই সংস্কার ছাড়া সড়কে স্থায়ী শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন।
সরজমিনে দেখা গেছে, নগরীর প্রধান সড়কগুলোর কিছু স্থানে ট্রাফিক সিগন্যালে অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরেছে। এআই ক্যামেরা স্থাপনের ফলে রাজধানীর বেশ কয়েকটি ট্রাফিক সিগন্যালের চিত্র বদলেছে। সব ধরনের চালকরা নিদিষ্ট স্থানে গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষায় থাকেন। নির্দিষ্ট সময় পর গ্রীন সিগন্যাল পড়লে আবার চলতে শুরু করেন। কিন্ত সিগন্যাল অতিক্রম করার পর আর সেই শৃঙ্খলা থাকে না। বিশেষ করে গুপরিবহনগুলো প্রায় সব সড়কেই নিয়ম ভাঙ্গার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকছে। শাহবাগ, বাংলামটর, কাওরানবাজার, ফার্মগেট, বিজয় সরনী, মহাখালি সিগন্যাল এলাকায় যানবাহনগুলো নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু যেখানে সিগন্যাল পড়ে না সেসব পয়েন্টে সব ধরনের যানবাহন এখনো বেপরোয়া। সেসব স্থানে গণপরিবহন চালকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো গাড়ি থামাচ্ছে। যাত্রী ওঠানামা করানোর জন্য রাস্তার বড় অংশ দখল করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে। এখানে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য কারো দায় দেখা যায় না। ট্রাফিক পুলিশও এখানে নিরব থাকে। ফলে রাজধানীর সড়কজুড়ে শৃঙ্খলা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
নগরীর কোনো সড়কেই লেন বা লাইন মেনে যানবাহন চলাচল করে না। নিয়ম না মেনে সড়কে লাইন বা লেন ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। বরং উল্টো পথে গাড়ি চালানো এখন আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও রিকশা উল্টোপথেও বেপরোয়া। রিকশার নানান ধরনের অনিয়মে নগরবাসী ও মোটরযান চালকদের ভোগান্তি বেড়েছে। অনেক সময় বাসস্ট্যান্ডগুলোতে কয়েকটি বাস পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থেকে সড়কের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি যানজটের অন্যতম কারণ।
আরো পড়ুন: ‘আজ যারা সংস্কার-সংস্কার করছেন কোথায় ছিলেন বিগত ১৭ বছর’
বাসযাত্রী মোস্তফা কামাল বলেন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এআই ক্যামেরা বসানোর পর ক্যামেরার সামনের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরেছে। কিন্তু মূল সড়কের অবস্থা যাচ্ছেতাই অবস্থায় রয়ে গেছে। নগরীর সব মূলসড়কে এই ক্যামেরা বসানো প্রয়োজন। শুধু কয়েকটি ট্রাফিক সিগন্যালে ক্যামেরা দিয়ে নগরীর সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। ব্যাটারি চালিত রিকশাগুলোতে মূল সড়কে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চালকদের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বপরি অনিয়মের ব্যাপারে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে সড়কের ওপর নজরদারী বাড়াতে হবে। এধরনের উদ্যোগ নেয়া হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলেন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা ছাড়া এ পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা যায় না। গণপরিবহনের যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামাও দীর্ঘদিনের সমস্যা। পাশাপাশি সিগন্যাল অমান্য করে উল্টো পথে গাড়ি চলাচলের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করতে পারলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সহজ হবে। কিন্তু গণপরিবহনে চাঁদাবাজি একটি বড় সমস্যা। কোটি কোটি টাকা চাঁদা উঠছে। পুলিশ, বিআরটিএ, প্রশাসন, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা এই চাঁদার ভাগ পায়। পরিবহন মালিক ও চালকরা চাঁদা দেয় বলেই তারা বেপরোয়া, কারো কথা বা সড়ক আইনের তোয়াক্কা করে না।
অন্যদিকে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ মনে করে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো পুলিশের একার পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না। এরজন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পুলিশ, যানবাহন চালক, পথচারী, যাত্রীদের সবাইকে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের একাধিক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা বলেন, শুধু শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সবার সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিশ্বের অনেক দেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া কঠিন হলেও অপরিপক্ক চালকরা এদেশে
তাড়াতাড়ি লাইসেন্স পায়। ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া প্রক্রিয়াকে কঠোর ও কার্যকর ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সড়ক ব্যবস্থাপনায়ও গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে।
