চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা কমলেও সব জায়গায় নয়
চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
গত কয়েকদিনের একটানা ভারী বৃষ্টিপাত, সমুদ্রের জোয়ার, পাহাড়ি ঢলে খাল-নালা উপচে নগরীতে তীব্র জলাবদ্ধতায় বিধ্বস্ত নগরবাসীর জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে শুক্রবার তেমন বৃষ্টি না হওয়াতে। শুক্রবার হঠাৎ খানিকটা রোদের দেখা মিলেছিল, তবে সারাদিনের অধিকাংশ সময় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন দেখা গেছে। তবে আবহাওয়া অফিস বলছে আবারো যে কোনো সময় মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় দেশের চার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের আট বিভাগে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। সাগর উত্তাল থাকায় লাইটারেজ জাহাজগুলো শুক্রবারও কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে নোঙর করা ছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত পণ্যবাহী জাহাজ থেকে পণ্য খালাস (লাইটারেজ) মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপটি দুর্বল হয়ে বর্তমানে মধ্য উত্তরপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় লঘুচাপ আকারে অবস্থান করছে। এটি আরও দুর্বল হতে পারে। তবে এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করায় সমুদ্রবন্দর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এদিকে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার) থেকে অতি ভারী (৮৮ মিলিমিটারের বেশি) বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, অতি ভারী বৃষ্টির কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমি ধসের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়া অধিদপ্তর দুর্যোগপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না যাওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছে।
আবহাওয়া অফিসের হিসেব অনুযায়ী গত ৪ জুলাই রাত নয়টা থেকে গত বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই রাত ৯ টা পর্যন্ত মোট বৃষ্টিপাত ১০৮০ মিলিমিটার রেকর্ড করা হয়েছে। এমনকি ৯ জুলাই রাত ৯টা পর্যন্ত এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ২২৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পানিবন্দি মানুষের খোঁজখবর নিতে শুক্রবার চান্দগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এমপি। এ সময় তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে কিছু ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে মতবিনিময় করেন।
পরিদর্শন শেষে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ নগরীর প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা থেকে ইতোমধ্যে পানি নেমে গেছে। তবে কিছু নিচু এলাকায় এখনো পানি জমে আছে। এসব এলাকায় কেন পানি দ্রুত নামছে না, তা স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই অবশিষ্ট এলাকাগুলো থেকেও পানি সম্পূর্ণ নেমে যাবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো জলাবদ্ধতা নিরসনে নিরবচ্ছিন্নভাবে মাঠে কাজ করছে।’
সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এমপি বলেন, জলাবদ্ধতা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষের পাশে বর্তমান সরকার রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
তবে নগরীর দক্ষিণ বাঁকলিয়ার শাহ আমানত সেতু বা নতুন ব্রিজের পূর্বদিকে বাঁকলিয়া শহীদ নুর হোসেন-ডা. মিলন-মোজাম্মেল-জেহাদ ডিগ্রি কলেজ রোডটি গত ৬ ধরে পানিতে সয়লাব হয়ে আছে। স্থানীয় বাস্তুহারা-ক্ষেতচর এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া এ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে প্রচুর খানাখন্দের কারণে এলাকাবাসী ও যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সড়কটির পাশের যে ছোট নালা রয়েছে সেটি পলিথিনসহ নানা ময়লা আবর্জনায় ভরে রয়েছে। ফলে নালার ময়লা-দূষিত পানি হাঁটু সমান হয়ে সড়কটি তলিয়ে যাওয়ায় কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করতে পারছে না।
এলাকার শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও খেটেখাওয়া মানুষজন অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। এলাকার কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাদের চিকিৎসক বা হাসপাতালে নেয়ার কোনো উপায় নেই। তার ওপর বাস্তুহারা ও ক্ষেতচরের মাঝামাঝি স্থানে বালু বিক্রির ব্যবসা চলছে। এই বালু পাশের নালায় পড়ে নালা যেমন ভর্তি হয়ে যাচ্ছে তেমনি সড়কে বালুভর্তি ভারী ট্রাক চলাচল করার সড়কটি আরো ভেঙে গেছে। এত বড় বড় গর্ত হয়েছে যে, প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে এলাকার অধিবাসীদের।
