কমলগঞ্জে বন্যা
২০টি গ্রামে পানিবন্দি মানুষ
বিকুল চক্রবর্তী, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির প্রভাবে মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। নিজের ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় বানের পানিতে ভেসে গিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধলাই নদীর পানি রাতের তুলনায় কিছুটা কমলেও এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে জুড়ি ও কুশিয়ারা নদীর পানিও বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন।
রাজনগর থানা অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন আহমদ ভূইয়া জানান, রাজনগরের টেংরা বাজার ইউনিয়নের আকুয়া এলাকায় বানের জলে ভেসে গিয়ে আশরাফ আলী (৭০) নামে একজন মারা গেছেন। ভোর রাতে তিনি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ভেসে যান। সকালে পাশের ডোবায় তার লাশ ভেসে উঠে। এলাকাবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ব্যাপারে স্থানীয় বাসিন্দা বদরুল ইসলাম জানান, ভোর ৪টার দিকে আশরাফ আলীর ঘরে পানি উঠায় তিনি ঘরের মালামাল সরাচ্ছিলেন। এ সময় পানির স্রোত তাকে টেনে নিয়ে যায়। রাতে বিভিন্ন এলাকা খোঁজাখুজি করে তাকে পাওয়া যায়নি। সকালে তার বাড়ির পাশের একটি ডোবা জলাশয়ে তার লাশ ভেসে ওঠে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ জানান, শনিবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বৃহস্পতিবার রাতে ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও পরদিন সকালে তা কিছুটা নেমে আসে। তবুও নদীসংলগ্ন এলাকায় বন্যার আশঙ্কা কাটেনি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনগর উপজেলা। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে উপজেলার টেংরাবাজার ইউনিয়নের উজিরপুর এলাকায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যায়। এতে উজিরপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় হাজারো মানুষ রাতেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে স্কুল ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে চলে যান। অনেক পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
অন্যদিকে কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নে ধলাই নদীর মখাবিল বাঁধ দিয়ে আকস্মিক পানি প্রবেশ করায় অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। শ্রীপুর, গোলেরহাওর, ভান্ডারীগাঁওসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি ঢুকে রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। কৃষিজমি ও আমন ধানের বীজতলা পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় কৃষকেরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আকস্মিকভাবে পানি বাড়তে থাকায় অনেকেই প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নেয়ার সুযোগ পাননি। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানান, জেলার প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বন্যাকবলিত মানুষের নিরাপত্তা, উদ্ধার কার্যক্রম ও ত্রাণ বিতরণে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো খুলে দেয়া হবে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আসাদুজ্জামান জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আবহাওয়া ও উজানের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আগামী কয়েকদিন বন্যা পরিস্থিতির আরো পরিবর্তন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকার ইসলামপুর ইউনিয়নের দুটি স্থানে বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে রাস্তাঘাট ও মানুষের বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে। গত রাতেই (বৃহস্পতিবার) কমলগঞ্জ উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের মাধ্যমে আমরা কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছি। এলাকায় পানি প্রবেশের খবর পেয়ে আজ ভোরেই ঢাকা থেকে কমলগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দিয়েছি। সেখানে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সরজমিনে পরিদর্শন করব। পাশাপাশি বাঁধ মেরামতে কী কী ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, সেটিও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা করব।
