বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আজ
প্রবীণ বাড়ছে, সঙ্গে সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঘাটতি
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে দিন দিন বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা। যা আগামী দিনগুলোতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা বেশি না বাড়লেও ২০২১ সাল থেকে এই প্রবণতা বাড়তে শুরু করেছে। ২০২৬ সাল থেকে এই বাড়তি ধারা আরো জোরেশোরে হবে বলে গত বছর এক প্রক্ষেপণ প্রতিবেদনে তুলে ধরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ‘পপুলেশন প্রজেকশন অব বাংলাদেশ: ডায়নামিকস অ্যান্ড ট্রেন্ডস ২০১১-২০৬১’ শীর্ষক বিবিএসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আগামী দিনগুলোতে প্রবীণ জনসংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে যাচ্ছে। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের তেমন কোনো প্রস্তুতি নেই। বেসরকারি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ থাকলেও এর পরিসর খুবই সীমিত।
বিবিএসের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৬৫ থেকে উপরের বয়সের ব্যক্তিদের সাধারণত বয়স্ক হিসেবে ধরা হয়। সে হিসাবে ২০১১ সালে যেখানে মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ ছিল বয়স্ক মানুষ- সেটি ২০১৬ সালে এসে কিছুটা কমে হয়েছিল ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ২০২১ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে। এই বছর ২০২৬ সালে এটা আরো বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ২০৩১ সালে হবে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ, ২০৩৬ সালে সেটি হতে পারে ১২ দশমিক ৯৫ শতাংশ, ২০৪১ সালে হতে পারে ১৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং ২০৪৬ সালে গিয়ে দাঁড়াতে পারে ১৭ দশমিক ৪৭ শতাংশে। এ ছাড়া ২০৫১ সালে ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ, ২০৫৬ সালে ২১ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং ২০৬১ সালে গিয়ে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে ২৪ দশমিক ৮১ শতাংশে।
এদিকে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল বা ইউএনএফ-এর ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এই জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশের বয়স শূন্য থেকে ১৪ বছর। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের মানুষ আছেন ৬৫ শতাংশের বেশি। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি। এই সংখ্যা ১১ কোটি ৪২ লাখ। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ প্রায় ৭ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন বয়স-কাঠামোর এই ধরন বাংলাদেশকে বাড়তি কিছু সুযোগ করে দিচ্ছে। অন্যদিকে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ বা সমস্যার মুখোমুখিও হতে যাচ্ছে। কারণ দেশে শিশুদের সংখ্যা কমে আসছে। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন।
আর গত বছর অক্টোবরে এক অনুষ্ঠানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) জানিয়েছে, চিকিৎসা ও জীবনমানের উন্নয়নের কারণে দেশে দ্রুত হারে বেড়ে যাচ্ছে বয়স্ক জনগোষ্ঠী। ২০২০ সালে যেখানে ৬০ বছর বা তার বেশি জনগোষ্ঠীর হার ছিল ১৩ শতাংশ, তা ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এতে অবাক হবার কিছু নেই। তবে তাদের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি দরকার। বয়স হলেও তারা কর্মক্ষম ও অভিজ্ঞ হয়ে যান। তাদের সেই অভিজ্ঞতাকে কীভাবে দেশের কাজে লাগানো যায় সেটি ভাবতে হবে। এ ছাড়া বয়স্কদের জন্য স্বাস্থ্য ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মৃত্যু হয়তো ঠেকানো যাবে না কিন্তু শেষ বয়সে এসে তারা যাতে যন্ত্রণামুক্তভাবে থাকতে পারেন সে জন্য সরকারি উদ্যোগ জরুরি। এক্ষেত্রে শুধু শারীরিক অসুস্থতাই নয়, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেকারত্ব ও বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার না হওয়ায় বাংলাদেশ জনসংখ্যার লভ্যাংশের সুফল পুরোপুরি নিতে পারছে না।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ ভোরের কাগজকে বলেন, ইউএনএফপি-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সের। তারা উপার্জন করার উপযুক্ত। অন্যের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল এমন মানুষের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ। শিশু ও প্রবীণদের অন্যের উপার্জনের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু আমরা বেশ কিছু কারণে জনসংখ্যার এই লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগাতে পারছি না। এর মধ্যে আছে- অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার নি¤œমান ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং অবকাঠামোর ঘাটতি। দেশে উপযুক্ত কাজ ও পারিশ্রমিক না পেয়ে অনেক মানুষ দেশের বাইরে থাকে, বাইরে যাচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, বাংলাদেশে কর্মক্ষম সব মানুষ উপার্জনে যুক্ত না। দেশে বেকারের সংখ্যা অনেক। সংস্থাটির সর্বশেষ জরিপ (২০২৪ সাল) বলছে, দেশে প্রায় ২৭ লাখ কর্মক্ষম মানুষ বেকার। তবে এটি বেকারত্বের আসল চিত্র নয়। বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত তারাই বেকার, যারা ৭ দিনে ১ ঘণ্টাও কোনো কাজ করেননি, কিন্তু কাজ করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। যদিও একজন মানুষ সাত দিনে মাত্র এক ঘণ্টা কাজ করলে তার কর্মক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারও হয় না। দেশে ১১ কোটি ৪২ লাখ কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে এই ধরনের মানুষ কত আছেন তার সঠিক সংখ্যা জানা যায় না।
সম্প্রতি এ প্রসঙ্গে এক অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে বয়স্কদের অংশ আগামীতে বাড়বে। এর ফলে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। এক্ষেত্রে সরকারের খুব বেশি প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না। তবে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যেই কিছু ওল্ডহোম তৈরির কাজ শুরু করেছেন। এর পাশাপাশি সরকারের চলমান বয়স্ক ভাতার কর্মসূচিতে টাকার অঙ্ক বাড়ানোর সঙ্গে এর আওতাও সম্প্রসারণ প্রয়োজন। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার চাইলেও সব বৃদ্ধকে ভাতা দিতে পারবে না। এক্ষেত্রে সর্বজনীন পেনশন স্কিম সচল করার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।
পাশাপাশি যারা নিম্ন আয়ের মানুষ, তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অবশ্যই সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। সেটি করা না গেলে শেষ জীবনে এসে এই শ্রেণির জনগোষ্ঠী অসহায় হয়ে পড়বে।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আজ
এই প্রেক্ষাপটে আজ শনিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির গভর্নিং কাউন্সিল জনসংখ্যা ইস্যুতে গুরুত্ব প্রদান ও জরুরি মনোযোগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই প্রথমবারের মতো ৯০টি দেশে দিবসটি উদযাপিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বছর বাংলাদেশ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘তরুণদের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলাদা বাণী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে আগামী রবিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও প্রাইভেট চ্যানেলগুলো বিশেষ কর্মসূচি সম্প্রচার এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে।
