প্রেমিকের মানসিক নিপীড়নে আত্মহনন করেন জবির অথৈ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা মজুমদার অথৈয়ের ‘আত্মহত্যার’ জন্য তার প্রেমিক ইয়াছিনের ধারাবাহিক ‘মানসিক নিপীড়ন’কে দায়ী করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এর মধ্যে ইয়াছিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে দাবি করেছেন তার পক্ষের আইনজীবী। গত বছরের ২৯ এপ্রিল সূত্রাপুরের লক্ষ্মীবাজারের নন্দলাল লেনের বাসায় আত্মহত্যা করেন অথৈ। তার প্রেমিক ইয়াছিন মজুমদারের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে এনে পরদিন সূত্রাপুর থানায় মামলা করেন মৃতের বাবা প্রণব মজুমদার।
সেই সময় লালবাগ এলাকায় ‘জমিদারি ভোজ’ রেস্তোরাঁয় ওয়েটার হিসেবে কর্মরত ছিলেন ইয়াছিন। ওইদিনই গ্রেপ্তারের পর ইয়াছিনকে কারাগারে পাঠানো হয়। কয়েকমাস কারাভোগের পর জামিন পান ইয়াছিন। তবে আদালতে গড় হাজির থাকায় গত ২৬ এপ্রিল জামিন বাতিল করে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার এসআই আলমগীর হোসেন তদন্ত শেষে গত ১৯ মে ইয়াছিনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। ১৪ জুলাই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় মামলা বদলির আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সোহানুর রহমান।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, মামলার তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে দিয়েছি। কী কারণে আত্মহত্যা করেছে, ভিকটিমের মনের কথা তো আমার পাওয়া সম্ভব না। মামলায় প্রেমিককে আসামি করেছিল। তাকে অভিযুক্ত করে বিস্তারিত অভিযোগপত্রে তুলে ধরেছি। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অথৈ ও ইয়াছিনের বাড়ি পাশাপাশি; তারা চট্টগ্রামের একটি স্কুলে পড়াশোনা করতেন। ইয়াছিন বিভিন্ন সময় অথৈকে প্রেমের প্রস্তাব দিলেও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পর অথৈ ২০২২-২০২৩ সেশনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে ভর্তি হন। থাকছিলেন সূত্রাপুর এলাকার একটি মেসে।
অথৈ ঢাকায় স্থানান্তর হলে ইয়াছিনও একই পথ ধরেন। চাকরি নেন লালবাগ এলাকায় ‘জমিদারি ভোজ’ রেস্তোরাঁয়। এরপর আগের মতোই অথৈকে ‘উত্যক্ত’ করতে থাকেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ‘প্রেমের সম্পর্ক’ গড়ে ওঠে জানিয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়, এরপর তাদের মধ্যে মোবাইল ফোনসহ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ হতো। তবে প্রেমের সম্পর্ক হওয়ার পর থেকে ইয়াছিন ‘অপমানজনক কথাবার্তা ও অপবাদ’ দিয়ে অথৈকে মানসিক নিপীড়ন করতেন। ঘটনার দিন ২৯ এপ্রিল অথৈ তার ক্যাম্পাসে সংগীত উৎসবের অনুশীলন শেষে মেসে ফিরছিলেন।
গেটের সামনে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াছিন সংগীত উৎসবে অংশগ্রহণ করতে অথৈকে বারণ করেন। এ সময় ওই তরুণ গালমন্দসহ অপমানজনক কথাবার্তা বলেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেনের ভাষ্য, ইয়াছিনের এ ধরনের আচরণ মেনে নিতে না পেরে অথৈ বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে কোনো একসময় সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ইয়াছিন ঘটনার সময় ও আগে মোবাইলে কথাবার্তা থেকে ধারণা করেন, অথৈ আত্মহত্যা করে থাকতে পারে। তিনি মেস বাড়ির মালিকসহ আশপাশের লোকজনকে নিয়ে অথৈয়ের রুমের দরজার লক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে অথৈকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেন। তাকে দ্রুত নিচে নামিয়ে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
অথৈয়ের বাবা প্রণব মজুমদার চট্টগ্রাম বসবাস করেন। তিনি বলেন, মেয়েটা মারা যাওয়ার পর খুব ভেঙে পড়েছি। অসুস্থ হয়ে গেছি। সন্তান হারানোর বেদনা ভুক্তভোগী বাবাই বোঝেন। সেই বেদনা কীভাবে কাটবে, সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ জানেন না। মেয়েটাকে নিয়ে অনেক আশা ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর প্লান ছিল ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাবে। কিন্তু তা আর হলো না। মেয়েটাকে পৃথিবী ছাড়তে বাধ্য করা হলো। আমি যার জন্য মেয়েকে হারিয়েছি, তার সাজা চাই।
প্রণব মজুমদারের দুই মেয়ের মধ্যে অথৈ ছিল ছোট। বড় মেয়ে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তর পড়ছে। অথৈকে নিয়ে বাবা পরিকল্পনা করেছিলেন, দেশে পড়াশোনা শেষে তাকে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাবেন। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি প্রণব মজুমদারের।
অথৈয়ের চাচাতো ভাই সুমন কুমার বলেন, ও যেদিন মারা যায় ওইদিন আমাদের ফুফাতো ভাইয়ের বিয়ের প্রোগ্রাম ছিল। কিন্তু কলেজের কালচারাল প্রোগ্রামের কারণে সে যেতে পারবে না বলে ওর বাবাকে জানায়। ওর বাবা ওকে বিরিয়ানি খাওয়ার জন্য ৫০০ টাকাও পাঠায়। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে কী এমন ঘটনা ঘটে গেল, সে আত্মহত্যা করল! আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমরা মামলা করেছি, কী হয়েছে না হয়েছে, সেই সত্য জানার জন্য। মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। বিচার আইনের গতিতে চলবে। সে বেঁচে থাকলে ব্যাপারগুলো অন্য রকম হতো।
বাদীপক্ষের আইনজীবী সুমন কুমার রায় দাবি করেন, মামলার অভিযোগপত্র আসছে। আসামির মানসিক টর্চারে ভিকটিম আত্মহত্যা করে। তাদের ফিজিক্যাল রিলেশনের একটা ছবি ছিল আসামির মোবাইলে। ওই ছবি দিয়ে ভিকটিমকে ভয় দেখাত। মানসিক টর্চার করত। তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। সিআইডি পুলিশের ফরেনসিক রিপোর্টে ওই ছবি পাওয়া গেছে। আসামি প্রথম থেকে দাবি করে আসছিল এমন কিছু নেই। যখন ফরেনসিক রিপোর্টে ছবি পাওয়া গেছে, এটা জেনে স্ট্রোক করেছে। তার আইনজীবীর জুনিয়র জানিয়েছে, সে মারাও গেছে।
অন্তরঙ্গ ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, এমন কিছু তদন্তে পাইনি।
আসামি পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, ছেলেটা খুব ভালো। কিন্তু সে সিরিয়াস অসুস্থ ছিল। মরার মতো অবস্থা। বেশ কয়েকদিন আগে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে- ওর পরিবার এটা জানিয়েছে। বাদীপক্ষের আইনজীবীকে বিষয়টি জানিয়েছি। আগামী তারিখে আদালতকেও অবহিত করব।
ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে এ আইনজীবী বলেন, ছেলেটাকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছি- এমন কিছু আছে কি না। তার কাছে কিছু নেই বলে জানিয়েছে। আর ওর ফিজিক্যাল ফিটনেস এমন ছিল না। গ্রেপ্তারের পর কারাগারে ছিল। জামিন চেয়েছিলাম মেডিকেল গ্রাউন্ডে। ওর শারীরিক কন্ডিশন শুনে আদালত ওকে জামিন দেয়। নগ্ন ছবি থাকার তথ্য সত্য নয়। বাদীপক্ষের আইনজীবীর তথ্য অসত্য।
