বনানীতে মা’র কবরের পাশেই শেষ শয়নে তৌফিক নেওয়াজ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
হুইল চেয়ারে করে গত ২৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন স্বামী তৌফিক নেওয়াজ। অসুস্থতার শেষ পর্যায়ে স্বামী তৌফিক নেওয়াজ তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে শেষবারের মতো দেখে নিয়েছিলেন। ওই দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমে তাদের এই দেখা হওয়ার খবর প্রচার হলে তা নজর কাড়ে সবার। স্বামীর অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করে গত ২৭ মে দীপু মনিকে ৭ দিন প্যারোলে মুক্তি দেয়ার আবেদনও করা হয়েছিল। সেই আবেদনে সাড়া দেননি মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক। গতকাল বৃহস্পতিবার আবার দেখা হলো- এই দম্পতির। কিন্তু কথা হলো না। প্রিজন ভ্যানে করে তৌফিক নেওয়াজকে দেখতে গিয়েছিলেন দীপু মনি। তৌফিক নেওয়াজ ছিলেন ফ্রিজার ভ্যানে। স্বামীকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বিদায় জানিয়ে প্রিজন ভ্যানেই ফিরলেন কারাগারে। প্রয়াত তৌফিক নেওয়াজের মরদেহও সকালে কলাবাগানের বাসায় নেয়া হয়। বাসার নিচে গ্যারেজে ফ্রিজার ভ্যানে রাখা হয় তার মরদেহ। গাড়ির পাশেই ফ্লোরে কাপড় পেতে স্থানীয় বশির উদ্দিন রোড মসজিদের মুয়াজ্জিনসহ কয়েকজনকে কুরআন তেলাওয়াত করতে দেখা যায়। পুলিশকে ওই বাড়ি ঘিরে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। ওই বাড়িতে যারা যাচ্ছিলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছিল পুলিশ। এদিকে গতকাল সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় প্রিজনভ্যানে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন দীপু মনি। সকাল সোয়া ৯টার দিকে তিনি কলাবাগানের বাসায় পৌঁছান। বাসায় পৌঁছে প্রিজনভ্যানে থাকা স্বামীর লাশ দেখে অশ্রæসিক্ত হয়ে পড়েন দীপু মনি। এ সময় সেখানে উপস্থিত স্বজনদের মধ্যেও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীপু মনির আইনজীবী গাজী ফয়সাল জানান, এই বাসাতেই দীপু মনির সঙ্গে তৌফিক নেওয়াজের প্রথম দেখা হয়েছিল। বেলা সোয়া ১২টার পর দীপু মনিকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। তার মিনিট দশেক আগে তৌফিক নেওয়াজের মরদেহ নিয়ে ফ্রিজার ভ্যান রওয়ানা করে গুলশানের দিকে। বাদ জোহর যখন জানাজার নামাজ চলছিল, প্যারোলে মুক্তি পাওয়া দীপু মনি ছিলেন মসজিদের সামনের প্রাঙ্গণে প্রিজন ভ্যানে। জানাজা শেষে ভ্যান থেকে নেমে শেষবারের মতো স্বামীকে দেখেন তিনি। এ সময় আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন মসজিদের প্রধান ইমাম মাওলানা আবদুর রহিম। এরপর তৌফিক নেওয়াজের ছোটভাই তাইমুর নেওয়াজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলেন। পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের পাশাপাশি তৌফিক নেওয়াজের বন্ধু, সহকর্মী এবং তার এক সময়ের সহপাঠীরাও জানাজায় অংশ নেন। আইনজীবী মহসীন রশিদ, মনিরুল আলম, সৈয়দ আশরাফুল হকও ছিলেন তাদের মধ্যে।
দীপু মনিকে সান্ত¡না দিতে এসেছিলেন চাঁদপুর আওয়ামী লীগের জাকিয়া সুলতানা শেফালী। তিনি বলেন, উনি ভালো নেই। এ সময় তার কী অবস্থা, সেটা তো বোঝা যায়। গুলশান মসজিদ থেকে তৌফিক নেওয়াজের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। পাশেই তার মা খায়রন নেছার কবর। এ সময় কবরস্থানে দীপু মনিও উপস্থিত ছিলেন। স্বামীর কবরে মাটি ছড়িয়ে দেন দীপু মনি।
দাফনের পর মোনাজাতে অংশ নেন দীপু মনিসহ উপস্থিত সবাই। বনানী গোরস্তান মসজিদের ইমাম মাওলানা ওমর ফারুক মোনাজাত পরিচালনা করেন।
স্বামীকে দাফনের পর বনানী কবরস্থানে নিজের বাবা এম এ ওয়াদুদের কবর জিয়ারত করেন দীপু মনি। ওয়াদুদ ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। কবর জিয়ারত শেষে বৃষ্টির মধ্যেই দীপু মনিকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়।
তৌফিক নেওয়াজের বন্ধু, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এমকে রহমান বলেন, তিনি অত্যন্ত সজ্জন মানুষ ছিলেন। ২০২০ সাল থেকেই নানা রোগে অসুস্থ ছিলেন। তৌফিক নেওয়াজ ও দীপু মনি দম্পতির এক ছেলে চীনে রয়েছেন। আর তাদের মেয়ে ঢাকাতেই থাকেন।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী তৌফিক নেওয়াজ গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে (সাবেক ইউনাইটেড) ৭৬ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি’র স্বামী। জুলাই আন্দোলনের সময়কার একাধিক মামলার আসামি হয়ে প্রায় দুই বছর ধরে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে বন্দি আছেন দীপু মনি। এই দম্পতির পুত্র তওকীর রাশাদ নেওয়াজ ও কন্যা তানি দীপাবলী নেওয়াজ।
ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজ আইন অঙ্গন ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের এক পরিচিত মুখ। ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করা তৌফিক নেওয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর উচ্চ শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি মর্যাদাপূর্ণ লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি তিনি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন গবেষণায় অবদান রাখেন। তিনি ১৯৮০ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অর্ডার প্রকাশ করেন। এছাড়া অক্সফোর্ডের ওয়াধাম কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ড. কামাল হোসেনের গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করেন এবং ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। আইন পেশার পাশাপাশি বিভিন্ন আইনি ও গবেষণামূলক কার্যক্রমে তার সরব উপস্থিতি ছিল এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতে তিনি অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তৌফিক নেওয়াজ ধ্রæপদি সংগীতের চর্চাও করতেন।
