ইমরান-সেনাবাহিনীর সমঝোতার ইঙ্গিত, কোন পথে পাকিস্তানের রাজনীতি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কারাগার থেকে মুক্তি পেলে দেশটির সামরিক বাহিনী বা সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতে জড়াবেন না বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি। তার এই বক্তব্যকে ইমরানের দল ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনার অন্যতম জোরালো ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুখারি বলেন, ইমরান খান মুক্তি পেলে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না, যাতে দেশের ক্ষতি হয়। দেশের স্বার্থে তিনি নিজের ক্ষোভ ও কষ্ট নিয়ন্ত্রণে রাখবেন বলেও দাবি করেন তিনি।
বুখারির ভাষায়, এর অর্থ সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো নয়। দেশের কল্যাণের জন্য ব্যক্তিগত কষ্ট ও ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
এমন বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট চিকিৎসার জন্য ইমরান খানকে কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে ইমরান ও সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কমানোর সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কিছু বিশ্লেষক।
দীর্ঘদিনের তিক্ত সম্পর্ক
ইমরান খান ও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তপ্ত। ২০২২ সালে সংসদে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়। ২০২৩ সালে ইমরান গ্রেপ্তার হলে তার সমর্থকেরা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন।
ইমরানের সমর্থকদের বড় একটি অংশ মনে করে, সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের কারণেই তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। ইমরান নিজেও অতীতে সেনাপ্রধান মুনিরের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন।
তবে এখন পিটিআইয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বক্তব্যে তুলনামূলকভাবে নমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যদিও বুখারি স্পষ্ট করে বলেছেন, পিটিআই ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি এবং এ নিয়ে কোনো আলোচনাও চলছে না।
বুখারি আসিম মুনিরকে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সেনাপ্রধান চাইলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেন।
পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনী বুখারির বক্তব্য নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। দেশটির সামরিক বাহিনী বরাবরই বলে আসছে, তারা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। অন্যদিকে সরকার দাবি করে আসছে, ইমরানের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো আদালতের বিষয়।
সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে নতুন আশা
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। পিটিআইয়ের মুখপাত্র বুখারি আদালতের এই সিদ্ধান্তকে ‘নতুন আশার আলো’ হিসেবে দেখছেন।
আদালতের নির্দেশ মেনে হাসপাতালের বাইরে দলীয় নেতাকর্মীদের জমায়েত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিটিআই। এরই মধ্যে ইমরানকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইমরানকে হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সামরিক বাহিনী ও পিটিআইয়ের মধ্যকার উত্তেজনা কমানোর সম্ভাব্য প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ইমরানের অবস্থান কতটা বদলেছে?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পিটিআইয়ের বর্তমান নেতৃত্বের বক্তব্য আর ইমরান খানের ব্যক্তিগত অবস্থান একই নাও হতে পারে। দলের অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন, আবার অনেকে কারাগারে আছেন। সরকারি অভিযানে দলটির সাংগঠনিক কাঠামোও অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ইমরান কারাগারে থাকা অবস্থায় কোনো আলোচনা বা সমঝোতা হলে পিটিআইয়ের নেতৃত্ব কতটা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে পারবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
বুখারি নিজেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন। তার দাবি, পিটিআইয়ের শীর্ষ নেতারা প্রায় আট মাস ধরে ইমরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেননি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও ইমরানকে দীর্ঘ সময় অনেকটা একাকী অবস্থায় রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে তার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি বক্তব্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সেপ্টেম্বরেই আবার আন্দোলনে পিটিআই
সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত কমানোর ইঙ্গিত দিলেও আন্দোলনের কর্মসূচি থেকে সরে আসছে না পিটিআই। বুখারি জানিয়েছেন, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী পদযাত্রার কর্মসূচি পালন করবে দলটি।
ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়া হোক বা না হোক, কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এতে ইমরানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, আইনজীবী ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া এবং তার মামলাগুলোর দ্রুত শুনানির দাবি জানানো হবে।
এর পাশাপাশি ইমরান খানের মুক্তির দাবিও তোলা হবে। আত্মগোপনে থাকা পিটিআইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতারাও কর্মসূচিতে অংশ নেবেন অথবা আন্দোলন সংগঠনে ভূমিকা রাখবেন বলে জানিয়েছেন বুখারি।
২০২২ সালে সংসদে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইমরান খানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। তিনি ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন। বর্তমানে ১৯ কোটি পাউন্ডের দুর্নীতির মামলায় তার ১৪ বছরের সাজা চলছে। একই মামলায় তার স্ত্রী বুশরা বিবিও সাত বছরের সাজাপ্রাপ্ত। তবে ইমরানের বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলার কয়েকটির সাজা স্থগিত বা বাতিল হয়েছে এবং কিছু বিষয়ে আপিল এখনো চলমান।
