স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পানি, স্যানিটেশন সেবায় বড় ঘাটতি বাংলাদেশে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পানি, স্যানিটেশন, হাত ধোয়ার সুবিধা, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা- এই ৫টি মৌলিক সেবার প্রায় প্রতিটিতেই বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর যৌথ মনিটরিং প্রোগ্রাম (জেএমপি)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘প্রোগ্রেস অন ওয়াটার, স্যানিটেশন, হাইজিন, এনভায়রনমেন্টাল ক্লিনিং অ্যান্ড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ইন হেলথ কেয়ার ফ্যাসিলিটিজ ২০১৫-২০২৫’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনে, বিশ্বের শতাধিক দেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ‘মৌলিক সেবা’ বলতে বোঝানো হয়েছে এমন সুবিধা, যা স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রাঙ্গণেই সরাসরি ব্যবহারযোগ্য। যেমন- প্রাঙ্গণে থাকা উন্নত পানির উৎস বা কার্যকর টয়লেট। এর তুলনায় ‘সীমিত সেবা’ বলতে বোঝানো হয়েছে আংশিক বা দুর্বল মানের সুবিধা। আর ‘কোনো সেবা নেই’ মানে ন্যূনতম মানও অনুপস্থিত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭১ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক পানি সেবা রয়েছে, ১৮ শতাংশে সীমিত এবং ১১ শতাংশে কোনো পানি সেবাই নেই। এই হার পাকিস্তানের (৭৫ শতাংশ) চেয়েও কম, ভারতে ৯৭ শতাংশ, ভুটানে ৯৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৯৬ শতাংশ, নেপালে ৮৩ শতাংশ ও আফগানিস্তানে ৮২ শতাংশ।
স্যানিটেশন সূচকে চিত্র আরো উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের মাত্র ২৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক স্যানিটেশন সেবা আছে। ৫৭ শতাংশে সীমিত সেবা এবং ১৮ শতাংশে কোনো সেবাই নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু ভারত উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। ভারতে এই হার ৭৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৩৩ শতাংশ, ভুটানে ২২ শতাংশ এবং নেপালে ২১ শতাংশ।
হাত ধোয়ার সুবিধাসহ মৌলিক হাইজিন সেবা রয়েছে বাংলাদেশের মাত্র ৩২ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, ৪০ শতাংশে সীমিত এবং ২৭ শতাংশে কোনো সেবাই নেই। এই সূচকে ভারত ৯৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ৯২ শতাংশ ও ভুটান ৮৫ শতাংশ অনেক এগিয়ে। নেপালেও এই হার ৭০
শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৫৫ শতাংশ। উভয়েই বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা সূচকে বাংলাদেশের চিত্র সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। মাত্র ২০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক সেবা রয়েছে, ৩১ শতাংশে সীমিত এবং প্রায় অর্ধেক-৪৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো সেবাই নেই। আফগানিস্তানে ৮৩ শতাংশ, ভারতে ৭৮ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কায় ৫৭ শতাংশ। নেপালের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়েও নাজুক। মাত্র ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক সেবা রয়েছে এবং ৮৪ শতাংশেই কোনো সেবা নেই।
স্বাস্থ্যসেবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। মাত্র ১৬ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা আছে, ৫৫ শতাংশে সীমিত এবং ২৮ শতাংশে কোনো ব্যবস্থাপনাই নেই।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে জাতিসংঘের হেলথ রিসোর্সেস অ্যান্ড সার্ভিসেস অ্যাভেইলঅ্যাবিলিটি মনিটরিং সিস্টেম (হেরামস)-এর আওতায় নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের একটি চিত্রও প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে একজন সেবাকর্মীকে প্রসূতি কক্ষের বাইরে মেঝে পরিষ্কার করতে দেখা যায়। এটিকে দেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বাস্তব চিত্রের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সার্বিকভাবে ৫টি সূচকের মধ্যে চারটিতেই- স্যানিটেশন, হাইজিন, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক তথ্যযুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল সারিতে, ভারত ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত পিছিয়ে। শুধু পানি সেবায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক ভালো, যদিও তা ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে কম। প্রতিবেদনে মালদ্বীপের জন্য এসব সূচকে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে- স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন, হাইজিন ও পরিচ্ছন্নতা সুবিধা না থাকলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে এবং রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী- উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষত প্রসূতি ও নবজাতক সেবায় নিয়োজিত কেন্দ্রগুলোতে এই ঘাটতি সরাসরি মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের সংক্রমণজনিত ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।
