সৌরবিদ্যুৎ খাতে সম্ভাবনা, প্রয়োজন বিশাল বিনিয়োগ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে শিল্প-কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি স্টাডিজের আয়োজনে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রুফটপ সোলার ইন আরএমজি সেক্টর’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। এ সময় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ খাতে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি আনার পাশাপাশি গ্রিন ফাইন্যান্স সহজ করা, দ্রুত অনুমোদন ও নেট মিটারিং ব্যবস্থা কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন বিশেষজ্ঞরা। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে আরএমজি খাত থেকে। কিন্তু জ্বালানি ও গ্যাস সংকটে অনেক কারখানা সক্ষমতার মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। ফলে বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে রুফটপ সোলারের ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
মেড ইন বাংলাদেশ (এমআইবি) ডেটাবেজের ৩ হাজার ৩২০টি কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণায় প্রায় ১ হাজার ৯০০টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার না করা কারখানাকে সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ৮৭৮টি কারখানার জরিপে দেখা যায়, ব্যবহৃত বিদ্যুতের মাত্র ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। রুফটপ সোলারের সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে শিল্প-
কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়, ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। একই বছর ঘোষিত জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচিতেও ২-৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, নেট মিটারিংয়ের জটিলতা, পুরনো কারখানার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অগ্নিনিরাপত্তা বিধিমালা, আমদানি ও এলসি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং গ্রিড সংযোগের অনিশ্চয়তাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, মূল্যায়ন করা প্রকল্পগুলোর মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে পৌঁছায়।
সেমিনারে বিকেএমইএর পক্ষ থেকে টেক্সটাইল ও নিট পোশাক খাতে জ্বালানি সংকট তুলে ধরে গ্রিন এনার্জি প্লান্ট স্থাপনে সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে সংকটকালীন টেক্সটাইল শিল্পে জোন-ভিত্তিক রোস্টার করে নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব দেয়া হয়।
বিডার পরিচালক শাহ নুসরাত জাহান বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিডার অন্যতম অগ্রাধিকার। ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন অনুযায়ী এ খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা করা হবে।’
বাংলাদেশ পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) প্রধান প্রকৌশলী স্বপন বনিক জানান, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ তাদের মাধ্যমে সারা দেশে বিতরণ করা হয়। ডিসেম্বরের মধ্যে বিআরইবির সব স্টেশন ও সাব-স্টেশনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া সৌর প্যানেল স্থাপনকারী গ্রাহকদের নেট মিটার দেয়ার কথাও জানান, যাতে তাদের সোলার থেকে প্রাপ্ত চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করতে পারেন।
সেমিনারে কালীগঞ্জের একটি কারখানার উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত কারখানাটি সৌরবিদ্যুতের ওপর পরিচালিত হচ্ছে। এতে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ হচ্ছে। তবে ১৭ মেগাওয়াটের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে সরঞ্জাম ও ইনভার্টার অনুমোদনে প্রায় আড়াই মাস অপেক্ষার কথাও জানানো হয়। বক্তারা বলেন, ‘রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নের পাশাপাশি দ্রুত অনুমোদন ও গ্রিড সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে দ্বিমুখী মিটারিং, গ্রিড সংযোগ ও বিলিং নিয়ে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। প্রকল্পের অনুমোদনে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগায় ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তাই এক জায়গা থেকে সমন্বিত অনুমোদনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’
গবেষণায় ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে একত্র করে ক্লাস্টারভিত্তিক বিনিয়োগ, ইডকলের মাধ্যমে ব্লেন্ডেড গ্রিন ফাইন্যান্স এবং দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।
