হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা ঘিরে নানা তৎপরতা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, হুমকি, ককটেল বিস্ফোরণ ও ঝটিকা মিছিলের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব তৎপরতার মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল দুর্বল করার চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ যুগান্তরকে বলেন, একটি কুচক্রী মহল ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে। পুলিশ ও প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দেওয়ার এই অপচেষ্টা সফল হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, পুলিশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও উসকানিদাতাদের আইনের আওতায় আনছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সামনের দিনগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
গত ২২ অক্টোবর নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় মাইকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রচারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে এ ধরনের প্রচারের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক এবং আওয়ামী লীগকে ঘিরে আলোচনা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল অভিযোগ করেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ তাদের পুরোনো মিত্রদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করছে। তবে সাধারণ মানুষ সতর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের বিচার আইন অনুযায়ী হবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আওয়ামী লীগ ঘটাচ্ছে, নাকি সরকারের ভেতর থেকে কেউ এর সঙ্গে জড়িত—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বা অন্য কেউ এসব ঘটনায় জড়িত থাকলে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি
সাম্প্রতিক নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে রাজধানীর মগবাজারে সংগীতশিল্পী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটেছে। শনিবার ভোর ৫টার দিকে বিশাল সেন্টারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। গুলিতে গাড়ির কাচ ভেঙে গেলেও ঘটনার সময় গাড়িতে আসিফ আকবর বা তার চালক ছিলেন না।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, সিসিটিভি ফুটেজে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে এক ব্যক্তিকে নেমে গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালাতে দেখা গেছে। পরে তিনি অটোরিকশায় উঠে মালিবাগের দিকে চলে যান। হামলাকারীর পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। ঘটনার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে কি না, তা-ও তদন্ত করা হচ্ছে।
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, ঘটনার বিষয়ে তখন পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে তদন্ত চলছিল এবং উদ্ধার করা গুলির খোসা পরীক্ষা করে অস্ত্রের ধরন জানার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
কুরিয়ার সার্ভিসে হামলা, মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি
রাজধানীর হাজারীবাগে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয় ও গুদামে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একদল দুর্বৃত্ত নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের লোক পরিচয় দিয়ে জমির মাসিক চার লাখ টাকা ভাড়া তাকে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এরপর তারা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে মালামাল লুট করে।
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিন মামলা করার পর তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফোনে তাকে এক দিনের মধ্যে মামলা তুলে নেওয়া বা সমঝোতা করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন জানান, বাদীর সঙ্গে হুমকিদাতার কথোপকথনের অডিও পাওয়া গেছে। সেটি যাচাই করে মামলার তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মূল অভিযুক্তদের কয়েকজন তখনও ধরা পড়েননি। হামলা ও ভাঙচুরে প্রায় ৩১ লাখ টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ভার্চুয়াল নম্বর ব্যবহার করে হুমকির অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার ঘটনা বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ ভার্চুয়াল ফোন নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো অ্যাপ এবং ভিপিএন ব্যবহার করে পরিচয় ও অবস্থান আড়াল করছেন।
গোয়েন্দা সূত্রের ধারণা, এ ধরনের তৎপরতার উদ্দেশ্য জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা। তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলমকে ফোনে হুমকি দেওয়ার একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে এক ব্যক্তি ডিসেম্বরের কথা উল্লেখ করে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি কামারুম মুনিরা বলেন, এ ধরনের হুমকির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট, ফোন নম্বর, বার্তা, অডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত যাচাই করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ জানানো এবং হুমকির বার্তা বা অডিও সংরক্ষণের পরামর্শও দেন তিনি।
খুলনায় সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ
খুলনা ও আশপাশের জেলাগুলোতে খুন, গুলিবর্ষণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২২ অক্টোবর মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনার পৃথক দুটি স্থানে গুলিতে দুজন নিহত হন। এর মধ্যে লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া এলাকায় খুশি বেগম নামে এক তরুণীকে তার মায়ের সামনে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে তুষার নামে আরেক তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। শনিবার তেরখাদা উপজেলায় এক স্থানীয় যুবদল নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটে।
শনিবার খুলনা বিভাগের কমিউনিটি পুলিশিং সুধী সমাবেশে পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান চলছে। পুলিশি কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, অপরাধ দমনে আইনানুগ ব্যবস্থা নিলে পুলিশকে নানা তকমা দিয়ে মনোবল দুর্বল করার চেষ্টা হয়। আবার কোথাও শিথিলতা দেখা গেলে জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের শনাক্ত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান উপায়।
সূত্র : সংগৃহীত
