মাটির নিচে শূন্যতা, বদলে যাচ্ছে প্রাচ্যের ভেনিস বরিশালের মানচিত্র !
এম.কে. রানা, বরিশাল
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
প্রাচ্যের ভেনিসখ্যাত নদী-খালবেষ্টিত বরিশাল নগরী নীরবে এগোচ্ছে এক অদৃশ্য সংকটের দিকে। খালি চোখে বোঝা না গেলেও প্রতিবছরই ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে নগরীর ভূমি। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন ভবনে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ভবন হেলে পড়ার ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের আশঙ্কা, ভূমি দেবে যাওয়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে বরিশাল জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্লাবনের সম্মিলিত ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এমন তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) এবং জার্মানির ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর জিওসাইন্স অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস (বিজিআর)-এর যৌথ গবেষণায়। জার্মান উন্নয়ন সহযোগিতার আওতায় পরিচালিত এ গবেষণায় অর্থায়ন করেছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। যদিও পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে এর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
আরও পড়ুন: জামায়াত এমপির অন্তরঙ্গ ভিডিও ভাইরাল, কে ওই নারী?
গবেষণায় ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বরিশাল নগরী ও আশপাশের এলাকার স্যাটেলাইট তথ্য, ভূ-গর্ভস্থ মাটির নমুনা এবং স্থাপনার উল্লম্ব গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, বছরে গড়ে ১ দশমিক ৬৬ মিলিমিটার করে ভূমি নিচে নেমে যাচ্ছে। কোনো কোনো বছরে এ হার বেড়ে ২৪ দশমিক ১৭ মিলিমিটারে পৌঁছেছে, যা প্রায় এক ইঞ্চির সমান।

গবেষণায় বছরে গড়ে ৫ দশমিক ৬৩ মিলিমিটার ভূমি উঁচু হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে গবেষকদের মতে, এটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ফল নয়; বরং নিচু এলাকা ভরাট করার কারণে সৃষ্ট কৃত্রিম পরিবর্তন।
গবেষণার সময় প্রথমে স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে নগরীর বৌদ্ধপাড়া ও বিএম কলেজ এলাকার কয়েকটি ভবনের অস্বাভাবিক উল্লম্ব বিচ্যুতি ধরা পড়ে। পরে সরেজমিনে গিয়ে নতুন নির্মিত একটি বহুতল ভবন কয়েক মিলিমিটার সামনে হেলে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে বটতলা, করিম কুটিরসহ আরও কয়েকটি এলাকায়। গবেষকদের মতে, এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ভূ-গর্ভস্থ মাটির স্তর ধসে পড়ার প্রভাব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমি দেবে যাওয়ার প্রধান কারণ দুটি—অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন। বহুতল ভবনের বাড়তি চাপের পাশাপাশি গভীর নলকূপের মাধ্যমে বছরের পর বছর নির্বিচারে পানি উত্তোলনের ফলে মাটির নিচে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সেই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে ওপরের মাটি ধীরে ধীরে বসে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: ভিডিও ভাইরালের পর তরুণীকে ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ দাবি জামায়াত এমপির, তারপর...!
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইমরান জানান, একসময় ৭০০ থেকে ৮০০ ফুট গভীরেই নিরাপদ সুপেয় পানি পাওয়া গেলেও বর্তমানে অনেক এলাকায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ ফুট পর্যন্ত পাইপ নামাতে হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ৮ থেকে ১০ বছর আগেও গ্রীষ্মকালে ১৫ থেকে ২০ ফুট নিচে পানির স্তর পাওয়া যেত। এখন সেই স্তর নেমে গেছে ৩০ থেকে ৪০ ফুটে এবং প্রতিবছরই আরও নিচে চলে যাচ্ছে।
বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এখন শুষ্ক মৌসুমে ডিপ টিউবওয়েলেও পানি ওঠে না। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মী ও পরিবেশ ফেলো মুরাদ আহম্মেদ বলেন, বছরে দেড় থেকে দুই মিলিমিটার ভূমি দেবে যাওয়া সামান্য মনে হলেও কয়েক দশক ধরে এ প্রবণতা চলতে থাকলে বরিশালের ভূমির উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। তখন স্বাভাবিক জোয়ারেই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত জিএসবির উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত গবেষণায় ভূমি দেবে যাওয়ার ধারাবাহিক প্রবণতা দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে নদী, খাল ও পুকুরের পানি পরিশোধনের মাধ্যমে ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
