পুরোনো পাতায় নতুন গল্প: সোনাদীঘির অর্ধশতকের পাঠশালা
তামিম হাসান বিভোর
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
একটি বই হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন একজন তরুণ। প্রথমে প্রচ্ছদ দেখলেন, তারপর কয়েকটি পাতা উল্টে ভেতরের লেখায় চোখ বুলিয়ে বইটির দাম জানতে চাইলেন। হাতে থাকা বইটির দাম নতুন বইয়ের তুলনায় অনেকটাই কম। তবুও শুরু হলো খানিক দরদাম। এরপর টাকা মিটিয়ে বইটি চলে গেল নতুন এক পাঠকের হাতে।
সড়কের দুই পাশে ফুটপাত ঘেঁষে ছোট ছোট দোকান। কোনো দোকানের নাম আছে, কোনোটি নামহীন। কোথাও টেবিলের ওপর বই, কোথাও কাঠের চৌকিতে সাজানো স্তূপ। উপন্যাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবই, টেস্ট পেপার থেকে চাকরির প্রস্তুতির বই, সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে বইয়ের এক বিচিত্র মেলা।
এই মেলার বয়সও কম নয়। ব্যবসায়ীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাজশাহীর সোনাদীঘির মোড়ের এই পুরোনো বইয়ের কেনাবেচার ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি পুরোনো। ১৯৭০ এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৮০ এর দশকের শুরুর দিকে সোনাদীঘি মসজিদের আশপাশে ফুটপাত ও ছোট কাঠের চৌকিকে ঘিরে এই ব্যবসার শুরু বলে জানান দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীরা।
তখন রাজশাহী ধীরে ধীরে আরও বড় হয়ে উঠছিল শিক্ষার্থীদের শহর হিসেবে। রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়া বাড়ছিল।সবার পক্ষে নতুন বইয়ের পুরো দাম দেওয়া সম্ভব হতো না। সেই আর্থিক বাস্তবতার মধ্যেই পুরোনো বইয়ের জন্য তৈরি হয় আলাদা বাজার।একসময় মসজিদের দেয়ালে ঝোলানো থাকত বইয়ের তাক। ফুটপাতেও চলত কেনাবেচা।সময়ের সঙ্গে দোকানের ধরন বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে কিন্তু বইয়ের প্রয়োজনটি রয়ে গেছে।
রাজশাহীর সোনাদীঘির মোড়ের পুরোনো বইয়ের দোকান। ছবি: লেখকবদলেছে যে বাজারের ঠিকানা
সোনাদীঘির মোড়ের পুরোনো বইয়ের বাজারের ইতিহাস শুধু বইয়ের নয়, শহরের পরিবর্তনেরও ইতিহাস। সোনাদীঘি ও আশপাশের এলাকার সংস্কার ও উন্নয়নকাজের সময় ফুটপাতের ভাসমান ও অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হয়।ব্যবসায়ীদের একটি অংশকে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়।ফলে আগের মতো মসজিদের দেয়াল কিংবা ফুটপাত জুড়ে সব দোকান আর নেই।অনেকে আশপাশের নির্দিষ্ট মার্কেট ও সিটি সেন্টারের দোকানে ব্যবসা সরিয়ে নিয়েছেন।তবু সোনাদীঘির মোড়ের সঙ্গে পুরোনো বইয়ের সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি।
কারণ বইয়ের ক্রেতারা এখনো নিয়মিত এখানে আসেন।বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক,স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী,বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে ভর্তিচ্ছু এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের আনাগোনা থাকে বেশি, এমনটাই জানান ব্যবসায়ীরা।
৩০০ টাকার বই ১০০ টাকা
এই বাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এর দাম।নতুন বইয়ের দোকানে যে বই কিনতে একজন শিক্ষার্থীকে কয়েকশ টাকা গুনতে হয়,পুরোনো বইয়ের বাজারে সেটিই কখনো অর্ধেক,কখনো তারও কম দামে পাওয়া যায়।হুমায়ূন আহমেদের "অপেক্ষা" নতুন বইয়ের বিক্রয়মূল্য প্রায় ৩০০ টাকা। সোনাদীঘির মোড়ে পুরোনো কপিটি পাওয়া যাচ্ছে ১০০ থেকে ১৬০ টাকায়। একইভাবে বিভিন্ন টেস্ট পেপার,সাজেশন ও সহায়ক বইও নতুন দামের অর্ধেকের কমে পাওয়া যায় বলে জানান বিক্রেতারা।দামের এই পার্থক্য শিক্ষার্থীদের কাছে নিছক হিসাব নয়। কখনো একটি বইয়ে বেঁচে যাওয়া টাকা দিয়ে আরেকটি বই কেনা যায়,কখনো মেসের খরচ বা যাতায়াতের টাকা মেটানো যায়।
রাজশাহী কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আহসান হাবিবের হাতে সেই হিসাবের বাস্তব উদাহরণ। ‘বাংলা ভাষার ইতিহাস’ বইটি নতুন কিনতে তার খরচ হতো ৪২০ টাকা। সোনাদীঘির মোড় থেকে সেটিই কিনেছেন ১৫০ টাকায়। এক বইয়ে সাশ্রয় ২৭০ টাকা।
আহসান হাবিব বলেন, “আমরা ছাত্র মানুষ। কিছু টাকা যদি বাঁচাতে পারি, তাহলে আমাদের জন্য খুব ভালো। নতুন বইয়ের দাম ৪২০ টাকা। এখান থেকে বইটা ১৫০ টাকায় পেয়ে গেলাম।” তার কাছে ব্যবহৃত বই মানেই নিম্নমানের বই নয়। “কেউ যখন পড়া হয়ে যায়, তখন বইটা সেল করে দেয়। ওই বইগুলোই আমরা নিচ্ছি। ভালো মানের বই কম দামে পাওয়া যায়। আমাদের জন্য খুব উপকার হয়,” বলেন তিনি।
১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ৫৫০
বাজারটির আরেকটি গল্প শুরু হয় উল্টো দিক থেকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান এসেছেন বই বিক্রি করতে।সঙ্গে পাঁচটি বই। বইগুলো কিনতে প্রায় এক বছর আগে তার খরচ হয়েছিল ১ হাজার ৬০০ টাকা।এখন সেই পাঁচটি বই বিক্রি করে পাচ্ছেন ৫৫০ টাকা। অনার্স শেষ হয়েছে। মেসে থাকেন।আগের বছরের বইগুলো রাখার মতো জায়গাও নেই। অনেক বইয়ের প্রয়োজনও শেষ। আগে এমন বই কাগজ সংগ্রহকারীদের কাছে কেজি দরে বিক্রি করে দিতে হতো।দাম মিলত খুব কম।এবার তাই পুরোনো বইয়ের বাজারে এসেছেন মেহেদী।
তার ভাষায়, এখানে বইগুলো কিছুটা ভালো দামে বিক্রি করা যায়।সবচেয়ে বড় কথা, ফেলে দেওয়া বা কাগজ হিসেবে বিক্রি হয়ে যাওয়ার বদলে বইগুলো আবার অন্য কারও পড়ার টেবিলে পৌঁছাবে।
বিক্রি করে পাওয়া ৫৫০ টাকা দিয়েই চাকরির প্রস্তুতির কিছু বই কেনার পরিকল্পনা তার। একজনের কাছে শিক্ষাজীবনের একটি অধ্যায় শেষ হচ্ছে। অন্যদিকে সেই বই হয়তো শুরু করবে আরেকজনের নতুন অধ্যায়।
বইয়ের সঙ্গে সংসারের হিসাব
এই বাজারের গল্প শুধু শিক্ষার্থীদের সাশ্রয়ের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিক্রেতাদের জীবনও। মোহাম্মদ ফজলুল আলী, বয়স ৩২। প্রায় এক দশক ধরে বইয়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তার ভাষায়, এই ব্যবসার আয় দিয়েই চলে সংসার।
তার দোকানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বই। কেনা দামের ওপর ভিত্তি করে বিক্রয়মূল্য ঠিক করেন তারা।১০০ টাকায় কেনা বই ১৫০ টাকা,৮০ টাকায় কেনা বই ১২০ টাকায় বিক্রি করার মতো হিসাবেই চলে ব্যবসা।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি দোকানে দিনে গড়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়। সাজেশন, টেস্ট পেপার ও ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ের সহায়ক বইয়ের চাহিদা বেশি। দৈনিক লাভ থাকে আনুমানিক ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। তবে দোকান ও দিনের বিক্রির ওপর ভিত্তি করে এ আয় কমবেশি হয়।
বাজারের প্রতিটি দোকানের চেহারাও এক নয়। কোনোটি পরিচিত নাম নিয়ে চলছে,কোনোটি আবার কোনোরকম সাইনবোর্ড ছাড়াই টিকে আছে।এসব দোকানের কাঠামো ছোট, পুঁজি সীমিত কিন্তু বইয়ের বৈচিত্র্য নানানরকম।
দরকষাকষির সংস্কৃতি
এই বাজারের আরেকটি নিজস্ব সংস্কৃতি হলো দরকষাকষি। নির্দিষ্ট মূল্যতালিকা নেই। বই হাতে নিয়ে ক্রেতা যেমন নিজের দাম বলেন,বিক্রেতাও জানান তার হিসাব।কয়েক দফা কথাবার্তার পর একটি দামে পৌঁছান দুজন।এখানে বইয়ের দাম শুধু প্রচ্ছদে লেখা মূল্যের ওপর নির্ভর করে না। বইটি কত পুরোনো, কী অবস্থায় আছে, বাজারে তার চাহিদা কত,নতুন কপি কত দামে পাওয়া যাচ্ছে, সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় দরদামের ভিত্তি।
একজন অভিজ্ঞ ক্রেতা হয়তো কম দামে বইটি বের করে নিতে পারেন।আবার কোনো চাহিদাসম্পন্ন বইয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতার দরও সহজে নড়ে না।ফলে বই কেনার পাশাপাশি এখানে চলে একধরনের দরদামের খেলা।
বৃষ্টিতে থেমে যায় বইয়ের বাজার
তবে ফুটপাতকে ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও স্পষ্ট, আবহাওয়া। বর্ষা এলে বৃষ্টির পানি থেকে বই রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়ে।ফলে অনেক দোকান স্বাভাবিকভাবে খোলা সম্ভব হয় না।কোনো দিন দোকান খুললেও দীর্ঘ সময় ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।যে ফুটপাত রোদের দিনে বইয়ের রঙে ভরে থাকে, বৃষ্টির দিনে সেখানেই নেমে আসে অস্থিরতা।বই সরিয়ে নেওয়া,পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা কিংবা দোকান গুটিয়ে ফেলার ব্যস্ততা শুরু হয়।ব্যবসা তাই এখানে শুধু ক্রেতার ওপর নির্ভর করে না,অনেকটা নির্ভর করে আকাশের মেজাজের ওপরও।
মোবাইলের যুগেও কাগজের বই
একসময় বইয়ের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল নতুন বইয়ের দোকান।এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী, মোবাইল ফোন। ইন্টারনেট,পিডিএফ ও ডিজিটাল কনটেন্টের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ার ধরন বদলেছে। অনেকেই এখন প্রয়োজনীয় বই বা নোট মোবাইলেই খুঁজে নেন।
দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী মো. হযরত আলীও এই পরিবর্তন দেখেছেন। ১৪ বছর বয়সে বইয়ের ব্যবসায় ঢুকেছিলেন তিনি। এখন বয়স ৪৩। তার চোখের সামনে বদলেছে বইয়ের বাজার, বদলেছে ক্রেতার ধরন।
তার মতে, মোবাইল ও ইন্টারনেটের কারণে আগের তুলনায় ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে।কিন্তু কাগজের বইয়ের প্রয়োজন এখনো শেষ হয়নি।সব ধরনের বই মোবাইলে পড়া সম্ভব নয়,এমনটাই মনে করেন তিনি। প্রায় তিন দশক ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে থাকা হযরত আলীর কাছে বাজারটির আরেকটি পরিচয় আছে, এটি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের জায়গা। তিনি চান,বাজারটি টিকে থাকুক এবং শিক্ষার্থীরা কম খরচে তাদের কাছ থেকে বই কিনুক।
পুরোনো বই, নতুন পাঠক
দিনের ব্যস্ততা বাড়ে। দোকানিরা বই সাজান। ক্রেতারা আসেন,পাতা উল্টান,দাম জিজ্ঞেস করেন। কোথাও দরদাম চলছে,কোথাও পুরোনো বইয়ের বিনিময়ে হাতে আসছে কিছু টাকা।
শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার সাধারণত সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বাজারে কেনাবেচা চলে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।দিনের প্রথম ভাগে এবং বিকেল থেকে সন্ধ্যার পর ক্রেতার চাপ বেশি থাকে।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে,সোনাদীঘির মোড়ের আশপাশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৫টি দোকান ও স্টল রয়েছে।শতাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে তাদের দাবি।বাজারের মোট দৈনিক লেনদেন প্রায় আড়াই লাখ টাকা হতে পারে বলেও ব্যবসায়ীদের ধারণা। এগুলো অবশ্য কোনো সরকারি বা আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নয়,ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব।
অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে বাজারটির চেহারা বদলেছে।কখনো দেয়ালে ঝোলানো তাক,কখনো ফুটপাতের চৌকি,কখনো নির্দিষ্ট দোকান,ঠিকানা বদলেছে বারবার।কিন্তু বইয়ের প্রয়োজন বদলায়নি।
আজ যে বইটি একজন শিক্ষার্থীর কাছে অপ্রয়োজনীয়,কাল সেটিই হয়তো আরেকজনের পরীক্ষার প্রস্তুতির প্রধান সহায়।যে শিক্ষার্থী নতুন বইয়ের দাম দিতে পারছেন না,তিনি পুরোনো বইয়ে খুঁজে পাচ্ছেন সাশ্রয়ের পথ।আর যে শিক্ষার্থীর পড়া শেষ,তার বইটিও কাগজের কেজি দরে হারিয়ে না গিয়ে ফিরে যাচ্ছে নতুন পাঠকের কাছে।তাই সোনাদীঘির মোড়ের এই জায়গাটি শুধু পুরোনো বই বিক্রির জায়গা নয় বরং এটি বইয়ের পুনর্জন্মের জায়গা।একজনের পড়া শেষ হলে বইটি শেষ হয়ে যায় না। তার পাতাগুলো অপেক্ষা করে আরেক জোড়া নতুন চোখের জন্য। মালিক বদলায়, দাম বদলায়, বদলায় ঠিকানাও, কিন্তু বইয়ের গল্প থামে না। সোনাদীঘি মোড়ের সেই গল্পই প্রতিদিন নতুন পাঠকের হাতে লেখা হয়।
লেখক: তামিম হাসান বিভোর, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক
