ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার এক দশক পার
জোড়াতালিতেই চলছে বেইলি সেতু
মো. নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু। ছবি: ভোরের কাগজ
বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩৭ বছরের পুরোনো একটি বেইলি সেতু। প্রতিদিন শত শত বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহনের ভার বহন করছে সেতুটি। কিন্তু বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই সেতু এখন নিজেই যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
গাড়ি উঠলেই কেঁপে ওঠে পুরো সেতু। স্টিলের পাটাতন থেকে বিকট শব্দ, কোথাও ফাটল, কোথাও ঢিলা নাট-বল্টু। কিছুদিন পরপর ঝালাই করে, স্টিলের প্লেট বদলে কিংবা নাট-বল্টু টাইট করে আবার চালু করা হয়। কিন্তু কয়েকদিন না যেতেই আবার দেখা দেয় একই সমস্যা। বেইলি সেতুটি এক দশক আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও এখনো নির্মাণ হয়নি নতুন সেতু। এতে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন চালক, যাত্রী ও সাধারণ মানুষ।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে বাসন্ডা নদীর ওপর প্রায় ৩৯৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৫ ফুট প্রস্থের এই বেইলি সেতুটি নির্মাণ করা হয়। এই বেইলি সেতুটি বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ ভারী যানবাহনসহ অসংখ্য ছোট-বড় যানবাহন সেতুটি ব্যবহার করে। এই সেতুর ওপর নির্ভর করছে ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ। কৃষিপণ্য, মাছ, শিল্পপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট এটি। অতিরিক্ত চাপের কারণে স্টিলের পাটাতন ফেটে যায়, নাট-বল্টু ঢিলে হয়ে পড়ে এবং সেতুর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে কিছুদিন পরপর মেরামত করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও একই অবস্থা তৈরি হয়।
আরও পড়ুন: এমপি নজরুলের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সিইসিকে চিঠি দিলো জামায়াত

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০১৬ সালে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সেতুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করলেও ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো নির্মাণ হয়নি নতুন সেতু। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন হাজারো মানুষ।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, যদি কোনোদিন সেতুটি ভেঙে পড়ে, তাহলে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। সওজের প্রকৌশলীরা নিয়মিত মেরামতের মাধ্যমে সেতুটি সচল রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভারী যানবাহনের চাপ এতটাই বেশি যে নতুন করে বসানো স্টিলের প্লেটও অল্প সময়ের মধ্যে বাঁকিয়ে যায় কিংবা ফেটে যায়। যেকোনো সময় সেতুটি ভেঙে পড়লে পুরো অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ১০ বছর ধরে নতুন সেতুর আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। অথচ এই সেতুটি বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা ও যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগের মাধ্যম। খুলনা-বরিশাল রুটের ট্রাক চালক মো. রুস্তম আলী বলেন, প্রতিবারই লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সাময়িক সংস্কার করা হচ্ছে, অথচ স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বছরের পর বছর কাগজেই সীমাবদ্ধ।

যাত্রীবাহী বাসচালক আব্দুর রহমান বলেন, প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে এই সেতু পার হতে হয়। গাড়ি উঠলেই সেতু কাঁপতে থাকে। দুর্ঘটনার ভয় নিয়েই চলতে হয়।জোড়াতালির পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় না করে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ করা উচিত।
স্থানীয় বাসিন্দা নাছির উদ্দীন বলেন, ব্রিজের ওপর দিয়ে ভারী গাড়ি চললেই বিকট শব্দ হয়। পুরো ব্রিজ দুলতে থাকে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেতুটি ভেঙে গেলে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে যাবে। আমরা দ্রুত নতুন সেতু চাই।
ঝালকাঠি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার শরীফ খান বলেন, বাসন্ডা বেইলি সেতুর পরিবর্তে নতুন স্থায়ী সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ডিপিপি অনুমোদন পেলেই নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণে জনমনে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় সম্প্রতি স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা মানববন্ধন করে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আগে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
